সোমবার
১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুখে উচ্চারণ করে রোজার নিয়ত করা কি জরুরি? নাকি মনে মনে করলেই হবে?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:২২ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

রোজা ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত, যার শুদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশেই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের সমাজে বহুকাল ধরে রোজার নিয়ত মুখে উচ্চারণ করার একটি প্রচলিত রীতি রয়েছে। বিশেষ করে “নাওয়াইতু আন…” দিয়ে নিয়ত না করলে রোজা হবে না।

এমন ধারণা অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। ফলে অনেক রোজাদার প্রশ্ন করেন, মুখে উচ্চারণ করে রোজার নিয়ত করা কি সত্যিই জরুরি, নাকি শুধু মনে মনে নিয়ত করলেই রোজা সহিহ হয়ে যায়। এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানতে হলে কুরআন, হাদিস ও ফিকহের আলোকে বিষয়টি বোঝা প্রয়োজন।

ইসলামী শরিয়তে নিয়ত বলতে বোঝায় অন্তরের দৃঢ় সংকল্প। আরবি ভাষায় ‘নিয়ত’ শব্দের অর্থই হলো উদ্দেশ্য বা মনস্থির করা। তাই নিয়তের মূল স্থান হলো হৃদয় বা অন্তর, জিহ্বা নয়। কোনো ইবাদত করার সময় অন্তরে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যে, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই কাজটি করছি—এটাই নিয়তের মূল ভিত্তি। রোজার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য।

আরও পড়ুনঃ রোজা অবস্থায় ব্যায়াম বা জিম করার সঠিক সময় কখন?

এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি মৌলিক হাদিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, “সব কাজই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পায়।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ইবাদতের মূল হলো অন্তরের নিয়ত। এখানে কোথাও মুখে উচ্চারণ করার শর্ত আরোপ করা হয়নি। ফিকহবিদদের মতামত অনুযায়ী, রোজার নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা ফরজ বা ওয়াজিব নয়। চার মাযহাবের আলেমদের ঐকমত্য হলো—মনে মনে নিয়ত করলেই রোজা সহিহ হয়ে যায়। এমনকি কেউ যদি মুখে কোনো শব্দ উচ্চারণ না করে শুধু মনে এই সিদ্ধান্ত নেয় যে, সে আগামীকাল রমজানের ফরজ রোজা রাখবে, তাহলেও তার নিয়ত সম্পন্ন হয়ে যায়।

তবে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করার প্রচলন কেন রয়েছে। এর কারণ হলো, মুখে উচ্চারণ করলে অন্তরের নিয়ত আরও দৃঢ় হয় এবং অনেক সাধারণ মানুষ এতে মানসিক স্বস্তি পায়। বিশেষ করে যারা ইবাদতের বিষয়ে নতুন বা যাদের মনে সন্দেহ তৈরি হয়, তাদের জন্য মুখে নিয়ত পড়া সহায়ক হতে পারে। এজন্য অনেক আলেম মুখে নিয়ত পড়াকে মুস্তাহাব বা উত্তম বলেছেন, কিন্তু কখনোই ফরজ বলেননি।

আরও পড়ুনঃ রোজার নিয়ত (নাওয়াইতু আন...): বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত।

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী রমজানের ফরজ রোজার ক্ষেত্রে নিয়তের সময়ও তুলনামূলক সহজ। সুবহে সাদিকের আগে নিয়ত করা উত্তম হলেও, যদি কেউ ফজরের পর থেকে দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত নিয়ত করে এবং এই সময়ের মধ্যে কোনো রোজাভঙ্গকারী কাজ না করে, তাহলে তার রোজা সহিহ হবে। এতে বোঝা যায়, শরিয়ত রোজার নিয়তের বিষয়ে সহজতা রেখেছে, কঠোরতা নয়।

অনেকে মনে করেন, নির্দিষ্ট আরবি বাক্য “নাওয়াইতু আন আসূমা…” না পড়লে রোজা হয় না। এই ধারণা শরিয়তসম্মত নয়। কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে প্রতিদিন রমজানের রোজার জন্য নির্দিষ্ট কোনো মুখে পড়ার বাক্য প্রমাণিত হয়নি। তারা মূলত অন্তরের নিয়তের ওপরই নির্ভর করতেন।

কুরআনের দৃষ্টিতেও ইবাদতের মূল বিষয় হলো অন্তরের অবস্থা। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক রূপ বা সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।” (সহিহ মুসলিম)। এই হাদিসের অর্থ থেকেও বোঝা যায়, আল্লাহর কাছে মুখে বলা শব্দের চেয়ে অন্তরের নিয়তই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুনঃ ইফতারের দোয়া (আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু...): কখন পড়বেন? ইফতারের আগে না পরে?

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, নিয়ত থাকা মানে অসচেতন থাকা নয়। কেউ যদি রাতে মনে মনে ঠিক করে যে সে রোজা রাখবে, আবার সকালে উঠে ভুলে গিয়ে খাবার খেয়ে ফেলে, তাহলে সেটি নিয়তের ত্রুটি নয়, বরং ভুলবশত রোজাভঙ্গের একটি আলাদা হুকুম রয়েছে। তাই নিয়ত করার সঙ্গে সঙ্গে রোজার বিধান সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, মুখে উচ্চারণ করে রোজার নিয়ত করা জরুরি নয়। মনে মনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেই নিয়ত সম্পন্ন হয়ে যায় এবং রোজা সহিহ হয়। মুখে নিয়ত পড়া একটি সহায়ক ও ভালো অভ্যাস হতে পারে, কিন্তু একে আবশ্যক মনে করা বা এটি ছাড়া রোজা হবে না—এমন ধারণা রাখা সঠিক নয়।

সুতরাং ইসলামী শরিয়তের আলোকে সঠিক সিদ্ধান্ত হলো—রোজার নিয়তের মূল হলো অন্তর। অন্তরে নিয়ত থাকলে রোজা সহিহ হবে, আর মুখে উচ্চারণ করা থাক বা না থাক—তা রোজার শুদ্ধতার জন্য শর্ত নয়।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X