

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রমজান মাসে রোজা পালন করার সময় অসুস্থতা বা চিকিৎসাজনিত কারণে অনেক মুসলমানকে বিভিন্ন ধরনের ড্রপ ব্যবহার করতে হয়। বিশেষ করে কানে বা নাকে ড্রপ দেওয়ার প্রয়োজন হলে রোজাদারদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রশ্ন দেখা দেয়—এই ড্রপ ব্যবহার করলে কি রোজা ভেঙে যায়, নাকি রোজা সহিহ থাকে। বিষয়টি সরাসরি চিকিৎসা ও ইবাদতের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় শরিয়তের সঠিক হুকুম জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামি শরিয়তে রোজা ভাঙার মূলনীতি হলো—ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছু শরীরের ভেতরের নির্দিষ্ট পথে প্রবেশ করানো, যা পেট বা মস্তিষ্কে পৌঁছে। ফিকহি আলেমরা এই নীতির ভিত্তিতেই আধুনিক চিকিৎসা উপকরণের হুকুম নির্ধারণ করেছেন। কানে ও নাকে ড্রপ দেওয়ার বিষয়টিও এই মূলনীতির আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
নাকে ড্রপ দেওয়ার ক্ষেত্রে আলেমদের মতামত তুলনামূলকভাবে কঠোর। কারণ নাক সরাসরি গলার সঙ্গে সংযুক্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অজুর সময় নাকে পানি দেওয়ার ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। সুনান আবু দাউদে বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেছেন, “নাকে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভালোভাবে পানি পৌঁছাও, তবে রোজা অবস্থায় অতিরঞ্জন করো না।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১৪২)
এই হাদিসের ভিত্তিতে চার মাজহাবের অধিকাংশ আলেম বলেছেন, নাকে ড্রপ দিলে এবং সেই ড্রপ যদি গলা বা পেট পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, নাকে ড্রপ দেওয়া হলে সাধারণত তা ভেতরে প্রবেশ করে এবং গলায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকে, তাই রোজা ভেঙে যায় এবং কাজা ওয়াজিব হয়। ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া ও রাদ্দুল মুহতার গ্রন্থে এই মাসআলা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কেউ যদি নাকে ড্রপ দেওয়ার পর গলায় কোনো স্বাদ বা ড্রপ পৌঁছানোর অনুভূতি না পান এবং নিশ্চিত হন যে ড্রপ ভেতরে প্রবেশ করেনি, তাহলে কিছু আলেমের মতে রোজা ভাঙবে না। কিন্তু বাস্তবতার দিক থেকে এই নিশ্চয়তা পাওয়া কঠিন হওয়ায় অধিকাংশ ফকিহ নাকে ড্রপ দেওয়া থেকে রোজা অবস্থায় বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন, যদি তা অতীব জরুরি না হয়।
কানের ড্রপের ক্ষেত্রে আলেমদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, কানের ভেতরে ড্রপ দিলে রোজা ভেঙে যায়। কারণ কানের ভেতরের পথকে শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশের একটি পথ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আল-মাবসুত ও রাদ্দুল মুহতার গ্রন্থে কানে তেল বা তরল প্রবেশ করালে রোজা ভাঙার কথা উল্লেখ আছে।
অন্যদিকে শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবের অনেক আলেমের মতে, কানের ড্রপ সাধারণত সরাসরি পেট বা গলায় পৌঁছে না, তাই এতে রোজা ভাঙে না—যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে ভেতরে প্রবেশ করে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিক থেকে অনেক ক্ষেত্রে কানের পর্দা ছিদ্র থাকলে ড্রপ ভেতরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই কারণে সতর্কতার নীতিতে অনেক সমসাময়িক আলেম কানের ড্রপকেও রোজা ভাঙার সম্ভাবনাময় হিসেবে গণ্য করেছেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রয়োজন ও অপ্রয়োজনের পার্থক্য। যদি রোজা অবস্থায় কানে বা নাকে ড্রপ ব্যবহার না করলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে শরিয়ত সে ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তোমাদের কেউ অসুস্থ হলে অথবা সফরে থাকলে সে অন্য দিনে এই সংখ্যা পূরণ করবে।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫)। অর্থাৎ অসুস্থতার কারণে রোজা ভাঙলে পরে কাজা আদায় করলেই যথেষ্ট।
আরেকটি মৌলিক নীতি হলো—কাফফারা কেবল ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার বা সহবাসের মাধ্যমে রোজা ভাঙলে ওয়াজিব হয়। চিকিৎসার প্রয়োজনে ড্রপ ব্যবহার করলে কাফফারা ওয়াজিব হবে না, বরং প্রয়োজনে শুধু কাজা আদায় করতে হবে।
সমসাময়িক বহু ফকিহ ও ফিকহ কাউন্সিলও বলেছেন, রোজা অবস্থায় নাকে ড্রপ দেওয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোজা ভাঙার কারণ হয়। আর কানের ড্রপের ক্ষেত্রে মতভেদ থাকলেও নিরাপদ মত হলো—রোজা অবস্থায় তা পরিহার করা। যদি ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে চিকিৎসার প্রয়োজনের কারণে রোজা ভেঙে পরে কাজা আদায় করা জায়েজ।
সব দিক বিবেচনায় ইসলাম এখানে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। একদিকে ইবাদতের পবিত্রতা রক্ষা, অন্যদিকে মানুষের স্বাস্থ্য ও প্রয়োজনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। শরিয়ত কখনো এমন কিছু আরোপ করে না, যা মানুষের জন্য কষ্টকর বা ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।
সুতরাং কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি গ্রন্থের আলোকে বলা যায়—রোজা অবস্থায় নাকে ড্রপ দিলে অধিকাংশ আলেমের মতে রোজা ভেঙে যায় এবং কাজা ওয়াজিব হয়। কানের ড্রপের ক্ষেত্রে মতভেদ থাকলেও সতর্ক মত অনুযায়ী এটিও রোজা ভাঙার সম্ভাবনা রাখে। তাই সম্ভব হলে এসব ড্রপ সেহরি বা ইফতারের পর ব্যবহার করা উত্তম। আর চিকিৎসার প্রয়োজনে দিনে ব্যবহার করলে পরে কাজা আদায় করলেই শরিয়তের বিধান পূর্ণ হবে।
মন্তব্য করুন

