শুক্রবার
১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোজা অবস্থায় নখ বা চুল কাটলে কি কোনো সমস্যা হয়?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:০২ পিএম
expand
রোজা অবস্থায় নখ বা চুল কাটলে কি কোনো সমস্যা হয়?

রমজান মাসে রোজা পালন করার সময় অনেক মুসলমান দৈনন্দিন ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাভাবিক কাজকর্ম নিয়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হন। এর মধ্যে একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—রোজা অবস্থায় নখ কাটা বা চুল কাটলে কি রোজার কোনো সমস্যা হয়, রোজা মাকরুহ হয়ে যায় কি না, কিংবা এতে রোজার সওয়াব কমে যায় কি না। শরিয়তের দৃষ্টিতে এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট ও সহজ উত্তর রয়েছে, যা জানা থাকলে অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ ও ভুল ধারণা দূর হয়।

ইসলামি শরিয়তে রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পানাহার ও কিছু নির্দিষ্ট কাজ থেকে বিরত থাকা। কুরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে পৃথক হয়ে যায়, তারপর রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৭)। এই আয়াতের আলোকে ফকিহগণ ব্যাখ্যা করেছেন যে, রোজা ভাঙার কারণ হলো ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য, পানীয় বা তাদের সমপর্যায়ের কিছু শরীরের ভেতরে প্রবেশ করানো, অথবা দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করা। নখ কাটা বা চুল কাটার সঙ্গে এই কোনো বিষয়ই সম্পর্কিত নয়।

ফিকহের সকল মাজহাবের আলেমদের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে যে, রোজা অবস্থায় নখ কাটা বা চুল কাটা জায়েজ এবং এতে রোজা ভাঙে না। এমনকি এটিকে মাকরুহও বলা হয়নি। কারণ নখ বা চুল কাটা শরীরের বাইরের একটি কাজ, যার মাধ্যমে কোনো কিছু গলার ভেতরে বা পেটে প্রবেশ করে না এবং রোজার মৌলিক শর্তের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়ে না। ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া, আল-হিদায়া এবং রাদ্দুল মুহতার গ্রন্থে এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

বরং ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য বজায় রাখাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিচ্ছন্নতাকে ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—“পাঁচটি বিষয় ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত: খতনা করা, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, গোঁফ ছোট করা, নখ কাটা এবং বগলের লোম পরিষ্কার করা।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৮৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৭)

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, নখ ও চুল পরিষ্কার করা ইসলামি সুন্নত ও স্বাভাবিক বিধানের অংশ। তাই রোজা অবস্থায় এসব কাজ করা যে নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয়—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। বরং প্রয়োজন হলে রোজা অবস্থায় নখ বা চুল কাটা সম্পূর্ণ বৈধ।

তবে সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে যে, রোজা অবস্থায় নখ বা চুল কাটলে রোজার সওয়াব কমে যায় বা রোজা নষ্ট হয়ে যায়। এই ধারণার পক্ষে কুরআন বা সহিহ হাদিসে কোনো প্রমাণ নেই। আলেমরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, এ ধরনের বিশ্বাস ভিত্তিহীন এবং কুসংস্কারের পর্যায়ে পড়ে। ইসলাম মানুষের ওপর অযথা কঠোরতা আরোপ করেনি, বরং সহজ ও বাস্তবসম্মত বিধান দিয়েছে।

আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য যে, হজ বা ওমরার ইহরাম অবস্থায় নখ বা চুল কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অনেক সময় মানুষ এই বিধানকে রোজার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। কিন্তু ইহরামের বিধান ও রোজার বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন। রোজার সঙ্গে ইহরামের এই নিষেধাজ্ঞার কোনো সম্পর্ক নেই। তাই রোজা অবস্থায় নখ বা চুল কাটাকে ইহরামের সঙ্গে তুলনা করা শরিয়তসম্মত নয়।

হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি ও হাম্বলি—চার মাজহাবের কোনোটি থেকেই রোজা অবস্থায় নখ বা চুল কাটাকে মাকরুহ বলা হয়নি। বরং অনেক আলেম বলেছেন, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ইবাদতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতে মনোযোগ বাড়ায়। তাই রোজা অবস্থায় নখ বা চুল কাটলে রোজার সওয়াব কমে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

তবে একটি দিক থেকে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন কিছু আলেম। যদি নখ বা চুল কাটার সময় এমন কোনো কাজ যুক্ত হয়, যার মাধ্যমে রোজা ভাঙার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যেমন মুখে চুল ঢুকে যাওয়া বা রক্ত গিলে ফেলা, তাহলে সেই বাড়তি বিষয়ের হুকুম আলাদাভাবে প্রযোজ্য হবে। তবে এটি নখ বা চুল কাটার কারণে নয়, বরং অন্য একটি কাজের কারণে রোজা ভাঙার সম্ভাবনা তৈরি হবে। মূল কাজ হিসেবে নখ বা চুল কাটার সঙ্গে রোজা ভাঙার কোনো সম্পর্ক নেই।

রমজান মাস আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের মাস। এই মাসে বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি অন্তরের পরিচ্ছন্নতাও গুরুত্বপূর্ণ। নখ বড় রেখে বা অস্বস্তিকর অবস্থায় থেকে ইবাদতে মনোযোগ নষ্ট হওয়ার চেয়ে পরিচ্ছন্ন থাকা উত্তম। শরিয়ত কখনো এমন কিছু চাপিয়ে দেয় না, যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে অকারণে কঠিন করে তোলে।

সবশেষে বলা যায়, রোজা অবস্থায় নখ বা চুল কাটলে রোজার কোনো সমস্যা হয় না। এতে রোজা ভাঙে না, মাকরুহ হয় না এবং সওয়াব কমে যায় না। বরং এটি একটি বৈধ ও স্বাভাবিক কাজ, যা ইসলামের পরিচ্ছন্নতার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সুতরাং কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি গ্রন্থের আলোকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—রোজা অবস্থায় নখ বা চুল কাটলে কোনো শরয়ি সমস্যা নেই। রোজাদার নিশ্চিন্তে এসব কাজ করতে পারবেন এবং তার রোজা সম্পূর্ণ সহিহ থাকবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X