

রমজান মাসে রোজা পালন করার সময় দৈনন্দিন ছোট ছোট বিষয় নিয়েও অনেকের মধ্যে দ্বিধা ও উদ্বেগ তৈরি হয়। এর মধ্যে একটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো—দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবার যদি গিলে ফেলা হয়, তাহলে কি রোজা ভেঙে যায়, নাকি রোজা সহিহ থাকে। বিষয়টি সূক্ষ্ম হলেও শরিয়তের দৃষ্টিতে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে, যা জানা প্রত্যেক রোজাদারের জন্য জরুরি।
ইসলামি শরিয়তে রোজা ভাঙার মূলনীতি হলো—ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছু শরীরের ভেতরে প্রবেশ করানো। তবে দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবারের বিষয়টি এই সাধারণ নীতির মধ্যেই একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও বিস্তারিত ব্যাখ্যার দাবি রাখে। কারণ এই খাবার কখনো মুখের ভেতরে দৃশ্যমান থাকে, আবার কখনো এতটাই ক্ষুদ্র হয় যে আলাদা করে বোঝা কঠিন।
ফিকহি আলেমরা দাঁতের ফাঁকে থাকা খাবারকে দুই অবস্থায় ভাগ করে এর হুকুম নির্ধারণ করেছেন। প্রথমত, যদি দাঁতের ফাঁকে থাকা খাবার খুবই সামান্য হয় এবং তা স্বাভাবিকভাবে লালার সঙ্গে নিজে নিজেই গলায় চলে যায়, তাহলে এতে রোজা ভাঙে না। কারণ এ ধরনের খাবারকে শরিয়তে নতুন করে খাবার গ্রহণ হিসেবে গণ্য করা হয় না। আল-হিদায়া ও ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া গ্রন্থে বলা হয়েছে, দাঁতের ফাঁকে থাকা অতি ক্ষুদ্র খাবার যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা হয়, তাহলে রোজা সহিহ থাকবে।
দ্বিতীয়ত, যদি দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবার তুলনামূলকভাবে বড় হয় এবং রোজাদার তা ইচ্ছাকৃতভাবে জিহ্বা দিয়ে বের করে গিলে ফেলে, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে। কারণ এখানে ইচ্ছাকৃত কাজ যুক্ত হয়ে গেছে এবং এটি নতুন করে কিছু পেটে প্রবেশ করানোর শামিল হয়। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে রোজা ভেঙে যাবে এবং কাজা ওয়াজিব হবে। এই মাসআলা রাদ্দুল মুহতার ও আল-মাবসুত গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
এখানে “বড়” ও “ছোট” খাবারের পার্থক্য কী—এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ফকিহদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যে খাবার সাধারণভাবে দাঁত থেকে বের করে নেওয়া যায় এবং আলাদা করে চেনা যায়, সেটিকে বড় হিসেবে গণ্য করা হবে। আর যে খাবার এতটাই ক্ষুদ্র যে আলাদা করে বের করা বা চেনা কঠিন, সেটিকে ছোট হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই পার্থক্যের ওপরই রোজার হুকুম নির্ভর করে।
অনেক সময় রোজাদার ঘুম থেকে উঠে বা অজু করার সময় দাঁতের ফাঁকে আগের রাতের খাবারের কিছু অংশ অনুভব করেন। যদি তিনি সেটি মুখ থেকে বের করে ফেলেন, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। বরং সেটিই উত্তম ও নিরাপদ পন্থা। কিন্তু যদি সেটি ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলেন এবং তা পরিমাণে উল্লেখযোগ্য হয়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে।
ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত কাজের পার্থক্য এখানে আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি দাঁতের ফাঁকে থাকা খাবার নিজের অজান্তেই লালার সঙ্গে গিলে যায় এবং রোজাদার তা ঠেকানোর সুযোগ না পান, তাহলে তা অনিচ্ছাকৃত হিসেবে গণ্য হবে এবং রোজা ভাঙবে না। কুরআনের সাধারণ নীতির আলোকে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভুল ও অনিচ্ছাকৃত কাজের ব্যাপারে উম্মতকে সহজ বিধান দিয়েছেন। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, ভুলে খেলে বা পান করলে রোজা ভাঙে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৩৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৫৫)। যদিও দাঁতের ফাঁকে থাকা খাবার সরাসরি এই হাদিসের বিষয় নয়, তবে ফকিহরা কিয়াসের ভিত্তিতে অনিচ্ছাকৃত গিলে ফেলার ক্ষেত্রে একই নীতির প্রয়োগ করেছেন।
শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবের অনেক আলেমও কাছাকাছি মত পোষণ করেছেন। তাদের মতে, যদি খাবার নিজে নিজে গলায় চলে যায় এবং রোজাদার ইচ্ছাকৃতভাবে তা গ্রহণ না করেন, তাহলে রোজা ভাঙবে না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেললে রোজা ভেঙে যাবে—এ বিষয়ে প্রায় সব মাজহাবেই ঐকমত্য রয়েছে।
এই মাসআলা থেকে একটি বাস্তব পরামর্শ পাওয়া যায়। রমজান মাসে সেহরির পর ভালোভাবে কুলি করা এবং দাঁত পরিষ্কার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে দিনের বেলায় দাঁতের ফাঁকে খাবার জমে না থাকে। এতে সন্দেহ ও জটিলতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তবে রোজা অবস্থায় দাঁত পরিষ্কার করার সময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে পানি বা টুথপেস্ট গলায় না চলে যায়।
অনেক সময় মানুষ অজ্ঞতাবশত মনে করেন, দাঁতের ফাঁকে থাকা যেকোনো খাবার গিলে ফেললেই রোজা ভেঙে যাবে। এই ধারণা সঠিক নয়। শরিয়ত এখানে সূক্ষ্ম পার্থক্য করেছে এবং মানুষের স্বাভাবিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছে। ইসলাম কখনো অযথা কঠোরতা আরোপ করেনি, বরং সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধান দিয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবার গিলে ফেললে রোজার হুকুম পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। যদি খাবার খুব সামান্য হয় এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে গিলে যায়, তাহলে রোজা সহিহ থাকবে। কিন্তু যদি খাবার বড় হয় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা হয়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে এবং কাজা আদায় করতে হবে। কাফফারা ওয়াজিব হবে না, কারণ এটি ইচ্ছাকৃত পানাহারের পর্যায়ে পড়ে না।
সুতরাং কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি গ্রন্থের আলোকে স্পষ্টভাবে বলা যায়—দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবার যদি ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা হয় এবং তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণের হয়, তাহলে রোজা ভেঙে যায়। আর যদি তা অতি সামান্য হয় এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে গিলে যায়, তাহলে রোজা ভাঙে না। এই সঠিক জ্ঞান থাকলে রোজাদার অপ্রয়োজনীয় ভয় ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন।
মন্তব্য করুন