শুক্রবার
১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোজা অবস্থায় বমি হলে কি রোজা ভেঙে যায়?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:১২ পিএম
expand
রোজা অবস্থায় বমি হলে কি রোজা ভেঙে যায়?

রমজান মাসে রোজা পালন করতে গিয়ে অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতা, বমিভাব কিংবা হঠাৎ বমি হওয়ার ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে গ্যাস্ট্রিক, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতার কারণে রোজাদারদের মধ্যে এই সমস্যা দেখা যায়। তখন সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি তৈরি হয়, তা হলো—রোজা অবস্থায় বমি হলে কি রোজা ভেঙে যায়, নাকি রোজা সহিহ থাকে। এই বিষয়টি সরাসরি রোজার বিধান ও শরিয়তের মৌলিক নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় সঠিক মাসআলা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামি শরিয়তে রোজা ভাঙার ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত কাজ ও অনিচ্ছাকৃত কাজের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা হয়েছে। বমির বিষয়টিও এই নীতির আলোকে বিবেচিত হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সুনান আবু দাউদ, তিরমিজি ও ইবনে মাজাহতে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—“যার অনিচ্ছায় বমি হয়ে যায়, তার রোজা ভাঙে না। আর যে ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করে, তার রোজা ভেঙে যায়।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২৩৮০; জামে তিরমিজি, হাদিস: ৭২০)

এই হাদিসের ভিত্তিতে চার মাজহাবের ফকিহগণ একমত যে, যদি কারো নিজের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই বমি হয়ে যায়, তাহলে তার রোজা সহিহ থাকবে। এ ক্ষেত্রে তার ওপর কোনো কাজা বা কাফফারা ওয়াজিব হবে না। কারণ এটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এবং শরিয়ত অনিচ্ছাকৃত কাজের জন্য বান্দাকে দায়ী করে না।

তবে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করে, অর্থাৎ মুখে আঙুল ঢুকিয়ে, পেট চেপে ধরে বা অন্য কোনো উপায়ে নিজে থেকে বমি উদ্রেক করে, তাহলে সেই রোজা ভেঙে যাবে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃত বমি যদি মুখভর্তি পরিমাণ হয়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে এবং কাজা ওয়াজিব হবে। আর যদি মুখভর্তি না হয়, তাহলে রোজা ভাঙবে না, যদিও এটি একটি অপছন্দনীয় কাজ হিসেবে বিবেচিত।

বমির পর যদি কিছু অংশ আবার ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা হয়, তাহলে সেক্ষেত্রেও রোজা ভেঙে যাবে। কারণ তখন সেটি নতুন করে কিছু পেটে প্রবেশ করানোর শামিল হয়। ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া ও রাদ্দুল মুহতার গ্রন্থে এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু চলে গেলে এবং তা প্রতিরোধ করার সুযোগ না থাকলে রোজা ভাঙবে না।

অনেক সময় বমি হওয়ার পর মুখে তিক্ত স্বাদ বা বমির চিহ্ন থেকে যায়। শুধুমাত্র সেই স্বাদ বা গন্ধ থাকার কারণে রোজা ভেঙে যায় না। বরং বমির পর মুখ পরিষ্কার করে নেওয়া জায়েজ, যতক্ষণ পর্যন্ত পানি বা অন্য কিছু গলায় না যায়। শরিয়ত এখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অনুমতি দিয়েছে, তবে সতর্কতা অবলম্বন করাকে উৎসাহিত করেছে।

এ প্রসঙ্গে কুরআনের একটি মৌলিক নীতি স্মরণযোগ্য। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬)। অনিচ্ছাকৃত বমি হওয়া মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তাই শরিয়ত এটিকে রোজা ভাঙার কারণ হিসেবে গণ্য করেনি।

আলেমরা আরও বলেন, রোজা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়লে বা বারবার বমি হলে নিজের স্বাস্থ্যের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। যদি এমন অসুস্থতা হয় যে রোজা রাখা কষ্টকর বা ক্ষতিকর হয়ে যায়, তাহলে শরিয়ত রোজা ভেঙে পরে কাজা আদায়ের অনুমতি দিয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, অসুস্থ ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে রোজা পূরণ করবে। (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫)

অনেকেই সন্দেহ করেন, হালকা বমিভাব বা শুধু ঢেকুরের সঙ্গে কিছু উঠে এলে রোজা ভেঙে যাবে কি না। ফকিহদের মতে, শুধু বমিভাব বা ঢেকুরের সঙ্গে কিছু উঠে এসে যদি তা মুখে না আসে কিংবা গিলে ফেলা না হয়, তাহলে রোজা ভাঙে না। কারণ এতে প্রকৃত বমির শর্ত পূরণ হয় না।

সব দিক বিবেচনায় ইসলাম এখানে অত্যন্ত সহজ ও মানবিক বিধান দিয়েছে। রোজা অবস্থায় অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হলে রোজা ভাঙে না এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে রোজা ভেঙে যায় এবং কাজা আদায় করতে হয়। তাই রোজাদারের উচিত এই মাসআলা ভালোভাবে জানা এবং অপ্রয়োজনীয় ভয় বা সন্দেহে না ভোগা।

সুতরাং সহিহ হাদিস, ফিকহি গ্রন্থ এবং আলেমদের সর্বসম্মত মতামতের আলোকে স্পষ্টভাবে বলা যায়—রোজা অবস্থায় নিজে নিজে বমি হয়ে গেলে রোজা ভাঙে না। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে রোজা ভেঙে যায়। এই বিধান জানা থাকলে রোজাদার সহজেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং ইবাদতে প্রশান্তি অনুভব করবেন।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X