

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রমজান মাসে রোজা পালন করা ইসলামের একটি ফরজ ইবাদত। রোজা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করা যে রোজা ভঙ্গের কারণ, তা মুসলমান মাত্রই জানে। তবে অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলে কিছু খেয়ে ফেলার ঘটনা ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে রোজা ভেঙে যায় কি না—এই প্রশ্নটি রোজাদারদের মধ্যে খুবই সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ। শরিয়তের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে স্পষ্ট ও সহিহ নির্দেশনা রয়েছে।
ইসলামি শরিয়তে নিয়ত বা ইচ্ছার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কোনো ইবাদত কবুল হওয়া বা নষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত কাজ ও অনিচ্ছাকৃত কাজের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য করা হয়েছে। রোজার ক্ষেত্রেও এই নীতিই প্রযোজ্য। কেউ যদি রোজা থাকার কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে খাবার বা পানি পান করে, তাহলে সেটিকে ইচ্ছাকৃত পানাহার হিসেবে গণ্য করা হয় না।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সুস্পষ্ট হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—“যদি কোনো ব্যক্তি রোজা অবস্থায় ভুলে খেয়ে ফেলে বা পান করে, তাহলে সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে। কারণ আল্লাহই তাকে খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৩৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৫৫)
এই হাদিসের আলোকে চার মাজহাবের সকল আলেম একমত যে, ভুল করে খাওয়া বা পান করার কারণে রোজা ভেঙে যায় না। বরং ওই রোজা সহিহ থাকে এবং রোজাদারকে দিনের বাকি সময় স্বাভাবিকভাবে রোজা পালন চালিয়ে যেতে হবে। এতে কাজা বা কাফফারা কোনোটিই ওয়াজিব হয় না।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। কেউ যদি ভুলে খাওয়া বা পান করা অবস্থায় স্মরণ হওয়ার পরও সঙ্গে সঙ্গে থেমে না যায় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে খাওয়া চালিয়ে যায়, তাহলে সে মুহূর্ত থেকে রোজা ভেঙে যাবে। কারণ তখন আর কাজটি ভুলের পর্যায়ে থাকে না, বরং তা সচেতন ও ইচ্ছাকৃত হয়ে যায়।
এ ক্ষেত্রেও ইসলাম অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। মানুষ ভুল করতে পারে—এই বাস্তবতাকে ইসলাম স্বীকার করেছে। কুরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে আমাদের রব, যদি আমরা ভুল করি বা ভুলে যাই, তবে তুমি আমাদের পাকড়াও করো না।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বহু মুফাসসির উল্লেখ করেছেন, ভুলের কারণে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে গুনাহগার করেন না।
শুধু খাবার বা পানীয় নয়, ভুল করে ওষুধ খাওয়া, পানি দিয়ে কুলি করতে গিয়ে গলায় পানি চলে যাওয়া কিংবা দাঁতের ফাঁকে থাকা খাবার ভুলে গিলে ফেলার ক্ষেত্রেও একই হুকুম প্রযোজ্য হবে—যদি তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত হয়। ফিকহি কিতাবগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অনিচ্ছাকৃত কাজের জন্য রোজা ভাঙে না। ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া, আল-মাবসুত ও আল-মুগনির মতো প্রামাণ্য গ্রন্থে এই মাসআলা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ আছে।
তবে এখানে একটি সামাজিক দায়িত্বের কথাও বলা হয়েছে। কেউ যদি অন্য কাউকে রোজা অবস্থায় ভুলে খেতে বা পান করতে দেখেন, তাহলে তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া ওয়াজিব। কারণ এটি নেক কাজে সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। তবে স্মরণ করিয়ে না দিলে রোজাদারের রোজা ভেঙে যাবে—এমনটি নয়। রোজা তখনো সহিহ থাকবে, যতক্ষণ সে নিজে ভুলে আছে।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, যদি ভুল করে বারবার খেয়ে ফেলা হয়, তাহলেও কি রোজা ভাঙবে না? আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত ভুল অবস্থা বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ রোজা ভাঙবে না। তবে এটি সাধারণত খুব বিরল ঘটনা। বাস্তবে স্মরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রোজাদারের উচিত থেমে যাওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও শোকর আদায় করা।
এখানে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, ভুল করে খাওয়ার বিষয়টি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কেউ যদি জানত যে সে রোজা রেখেছে, কিন্তু নিজেকে ভুলে যাওয়ার অজুহাতে খাওয়া চালিয়ে যায়, তাহলে তা শরিয়তসম্মত নয়। নিয়ত ও বাস্তব অবস্থার ওপরই শরিয়তের বিধান নির্ভর করে।
সবশেষে বলা যায়, ইসলাম রোজাকে মানুষের জন্য কষ্টকর নয় বরং সহজ ও কল্যাণকর ইবাদত হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ভুলে কিছু খেয়ে ফেললে রোজা ভেঙে যাবে—এই ভয়ে অযথা দুশ্চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস অনুযায়ী এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি রহমত হিসেবেই গণ্য হয়।
সুতরাং সহিহ হাদিস, কুরআনের আয়াত এবং ফিকহি আলেমদের ঐক্যমতের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—ভুল করে কিছু খেয়ে ফেললে বা পান করলে রোজা ভেঙে যায় না। রোজাদারকে শুধু স্মরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমে যেতে হবে এবং দিনের বাকি সময় রোজা পূর্ণ করতে হবে।
মন্তব্য করুন

