


জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার তিন মাস পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব এবং এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন সরদার আমিরুল ইসলাম সাগর।
দলের সাথে নিজের আদর্শের মিল এবং কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান আমিরুল ইসলাম।
তবে, এনসিপির ঢাকা উত্তরের নেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়টি সামনে আসায় তিনি পদত্যাগ করেন বলে মনে করছেন দলটির ঢাকা উত্তর শাখার নেতা-কর্মীরা।
গতকাল রোববার সরদার আমিরুল ইসলাম সাগরের পদত্যাগের গুঞ্জন ওঠে। তবে তিনি এনপিবি নিউজকে জানান, আরো বেশ কয়েকদিন আগেই পদত্যাগপত্র জমা দেন। কেন্দ্রীয় কমিটি পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় থাকে। অবশেষে গতকাল তার পদত্যাগের ঘটনা জানাজানি হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমিরুল ইসলাম এনপিবি নিউজকে বলেন, 'দীর্ঘ দুই মাস ধরেই ভাবছিলাম পদত্যাগ করার কথা। অবশেষে কয়েকদিন আগে পদত্যাগপত্র জমা দেই কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে। তারা বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। কিন্তু বিষয়টা এভাবে ঝুলে থাকায় অস্বস্তি হচ্ছিলো। তাই আজ (রবিবার) জানিয়ে দেই কয়েকজনকে।'
পদত্যাগ করলেন কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে আসলে কাজের সুযোগ কমে গিয়েছিল। আমি নিজের মত কাজ করতে পারছিলাম না। তাই দল থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তবে তার পদত্যাগের বিষয়ে এনসিপি ও ঢাকা উত্তর শাখায় আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগের গুঞ্জন শোনা যায়। ঢাকা উত্তরের সদস্য সচিব আমিরুল ইসলাম সাগর নির্বাচনকালীন সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন।
সে সময়ে নির্বাচন পরিচালনার জন্য কেন্দ্র থেকে আর্থিক বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেই টাকার সঠিক খরচ করেননি এবং খরচের হিসাব সঠিকভাবে দেননি বলে অভিযোগ করেন ঢাকা উত্তর এনসিপির কয়েকজন নেতা।
এনসিপি ঢাকা উত্তরের নেতা তৌফিক নিয়াজ এনপিবি নিউজকে বলেন, 'অক্টোবরে আমাদের ঢাকা উত্তরের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। সেখানে সাগর ভাই সদস্য সচিবের দায়িত্ব পান। আহ্বায়ক হন আরিফুল ইসলাম আদীব ভাই। এর মাসখানেক পরেই নির্বাচনের তোরজোর শুরু হয়।
আদীব ভাই নির্বাচনে ব্যস্ত থাকায় সার্বিক দায়িত্ব আসে সদস্য সচিবের কাছে। কেন্দ্র থেকে নির্বাচন পরিচালনার জন্য ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তার কাছ থেকে কোনো একটা কমিটি আর্থিক সাহায্য পায়নি। তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তখন বলেন, কেন্দ্র থেকে কোনো টাকা পাননি। নিজ খরচেই নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করতে নেতাকর্মীদের জানান সাগর ভাই।'
তৌফিক আরো বলেন, 'নির্বাচন পরবর্তী সভায় আমরা সবাই জানতে পারি যে নির্বাচনের খরচ সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর যখন সাগর ভাইয়ের কাছে হিসাব বিবরণী চাওয়া হয় তিনি হিসাব দিতে পারেননি। এ ক্ষোভ থেকেই তিনি মূলত বেশ কিছুদিন নিষ্ক্রিয় ছিলেন। আজ (রবিবার) জানলাম তিনি পদত্যাগ করেছেন।'
এনসিপি ঢাকা উত্তরের আরেক নেতা নূর আমিন খান এনপিবি নিউজকে বলেন, 'আর্থিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছিল আমাদের সদস্য সচিবের বিরুদ্ধে। এপ্রিল মাসের ২২ তারিখে আমাদের সাধারণ সভায় এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়।
তিনি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। বরং একটি গোজামিল হিসাব দেওয়া হয় যেখানে তিনি আমাকে টাকা দেওয়ার কথা বলেন। অথচ তিনি আমাকে কোনো টাকা দেননি। এ বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে যান দলীয় কার্যক্রম থেকে।'
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরদার আমিরুল ইসলাম সাগর অভিযোগ নাকচ করে দেন। তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন, 'আর্থিক অভিযোগ ওঠার বিষয়টি সম্পূর্ণ অসত্য। এসব বিষয়ে ঢাকা উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। আমার বিরুদ্ধে আর্থিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ অবান্তর।'
সার্বিক বিষয়ে জানতে এনসিপির ঢাকা মহানগরী উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে এনসিপির দপ্তরের দায়িত্বে থাকা সাদিয়া ফারজানা দীনার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির একজন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নেতা এনপিবি নিউজকে বলেন, 'এমন একটি অভিযোগ উঠেছিল বলে শুনেছি। আমিরুল ইসলাম সাগরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এরপর থেকেই তাকে দলীয় কোনো কার্যক্রমে পাওয়া যায়নি।'
নতুন দল হিসেবে এনসিপির এমন পদত্যাগে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'দেখেন, আদর্শিক বা সাংগঠনিক কোনো কারণে যদি একটি শাখার সেকেন্ড ম্যান পদত্যাগ করেন তার সঙ্গে আরো অনেক নেতাকর্মীই পদত্যাগ করেন।
কিন্তু এক্ষেত্রে আমিরুল ইসলামে একাই পদত্যাগ করেছেন। আর কোনো নেতা বা কর্মী পদত্যাগ করেননি। এ থেকে এটা স্পষ্ট যে পদত্যাগের ঘটনাটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। পাশাপাশি যে কোনো অনৈতিক বিষয়ে দল যে কোনো ছাড় দেয় না এবং অন্যায় করা কারো জন্যই এ দলে জায়গা নেই সেটা স্পষ্ট হলো। তার পদত্যাগে কোনো প্রভাব পড়বে না বলেই আমি নিশ্চিত।'
আমিরুল ইসলাম সাগর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। ২০১৭ সালের আগস্টে তিনি ফেসবুকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বহিষ্কার হন। তবে ২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল তার বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করে সাগরকে সংগঠনে ফিরিয়ে নেয় ছাত্রদল।
ঢাবিতে নিহত হওয়া ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্যর বড় ভাই আমিরুল ইসলাম এনসিপি যোগ দেওয়ায় আলোচনা তৈরি হয়েছিল। সেই তিনি এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন।