


বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অনেকে।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ কেন দিলো- এটি আমাদের প্রশ্ন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। সেই প্রসঙ্গে টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেখানে আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন; তাকে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলা সুযোগ দেওয়া হলো।
বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার কেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর এই সুযোগ দিলো-এই প্রশ্নও রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পাঁচই অগাস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে নয়া দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। সেই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। সরকারি দল বিএনপির নেতৃত্বের মাঝেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে দলটির নেতাদের অনেকে বলছেন।
বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনা দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাইবেন কি না, নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সেই প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন তিনি।
ওই সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকা তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে একপক্ষকে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে; একপক্ষ দায়মুক্তি পেলে অন্যপক্ষেরও সে অধিকার আছে।
দুই বছর আগে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলটির নেতাদের কোনো অনুশোচনা না থাকায় বাংলাদেশে বর্তমানে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আসছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেনি বা ক্ষমা চায়নি। এমনকি তাদের কোনো অনুশোচনা নেই।
বরং তারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে থেকে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে। জনগণ তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ, মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
দুই বছর আগে শেখ হাসিনার শাসনের পতন হলে সে সময় গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান এনে ওই অধ্যাদেশ যুক্ত করা হয়েছিল।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর এই সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী প্রস্তাব সংসদে পাস করে। ফলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থেকে যায়।
নয়া দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা তাদের দলের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির ব্যাপারে বিচার হবে। সংশ্লিষ্ট আইনে সেই বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ এ-ও বলেন, বিএনপি নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে চায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়। তারা তো (আওয়ামী লীগ) আদালতে যায়নি। আদালত থেকেই যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেভাবেই সরকার কাজ করবে।
একইসাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে, জনগণও বিচার করবে। জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। তাদের দীর্ঘ শাসনে বিরোধী দল ও মতের মানষকে দমন-পীড়ণ চালিয়েছে; গুম, খুন করেছে। ফলে তাদের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই এবং তাদের ব্যাপারে জনগণও বিচার করবে।
এদিকে, ভারতের নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হতে পারেন, এমন খবর যখন আলোচনায় আসে, তখনই বাংলাদেশের বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
গত সোমবার ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা দিল্লিতে শেখ হাসিনা যাতে রাজনৈতিক কার্যক্রম না চালায়, সেজন্য ভারত সরকারের সহযোগিতা চান।
একই দিনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ভারত সরকারকে এ বিষয়ে অবস্থান 'স্পষ্ট' করতে আহ্বান জানান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ঘিরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন, দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার চেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এছাড়া এরপর মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশনা তুলে ধরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য বিবরণীতে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচার না করতে অনুরোধ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে 'আইনগত ব্যবস্থা' নেওয়ার কথাও বলেছিলেন।
যদিও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবাদ সম্মেলনটি বেসরকারিভাবে আয়োজন করা হচ্ছে। এরসাথে ভারত সরকারের সম্পর্ক নেই। এবং সেখানে যে বক্তব্য আসবে, তা ভারত সরকার সমর্থন করে না।
কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরও নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন হয়েছে এবং তাতে শেখ হাসিনা সরাসরি বক্তব্য ও প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।
বিএনপি সরকারের একাধিক সূত্র বলছে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যে বক্তব্যই দেওয়া হোক না কেন, তাদের সমর্থন ছাড়া নয়া দিল্লিতে এ ধরনের সংবাদ সম্মেলন করা সম্ভব নয় বলে তারা মনে করেন।
আর সেকারণে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ও দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্য থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে।