রবিবার
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশ— হাইব্রিড নেতাদের চাপে কি আদর্শচ্যুত হচ্ছে বিএনপি?

আশ্রাফুল আলম
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০২:৪০ পিএম
expand
জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশ— হাইব্রিড নেতাদের চাপে কি আদর্শচ্যুত হচ্ছে বিএনপি?

১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত দলটি ২০২৬ সালে ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠার সময় জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক দর্শন ও ১৯ দফা কর্মসূচিকে সামনে এনেছিলেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, উৎপাদন বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরশীলতা এবং বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। বিএনপির নিজস্ব ইতিহাসেও ১৯ দফা কর্মসূচিকে দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু প্রায় পাঁচ দশকের এই পথচলার পর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে—জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শ ও বিএনপির বর্তমান রাজনীতির মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে? জিয়ার রাজনীতি ও বিএনপির জন্ম ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধারার সূচনা হয়। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক চিন্তায় জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।

দলের প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর বিএনপির নেতৃত্বে আসেন তাঁর সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর নেতৃত্বে দলটি বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে এবং দীর্ঘ সময় বিরোধী দল হিসেবেও আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে।

আদর্শ বনাম বাস্তব রাজনীতি

রাজনৈতিক দল বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নেতৃত্বের পরিধিও বিস্তৃত হয়। বিএনপির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কয়েক প্রজন্মের নেতাকর্মী দলটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তবে বিএনপির ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন রয়েছে—দলের আদর্শে বিশ্বাসী ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের তুলনায় সুযোগসন্ধানী, সুবিধাভোগী কিংবা রাজনৈতিকভাবে নতুন কিন্তু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গুরুত্ব বাড়ছে কি না।

সমালোচকেরা যাদের ‘হাইব্রিড নেতা’ বলে আখ্যায়িত করেন, তাদের নিয়ে বিএনপির তৃণমূলের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ—দলের কঠিন সময়ে যারা মাঠে ছিলেন, মামলা-হামলা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে তারা কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পাননি। বিপরীতে রাজনৈতিক সুবিধা বিবেচনায় পরে যুক্ত হওয়া কিছু ব্যক্তি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে আসছেন।

অবশ্য ‘হাইব্রিড নেতা’ শব্দটি একটি রাজনৈতিক অভিমত; এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক শ্রেণিবিন্যাস নয়। ফলে কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ প্রয়োজন।

তৃণমূলের ক্ষোভ কতটা যৌক্তিক?

বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মতো বিএনপিরও সবচেয়ে বড় শক্তি তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর প্রত্যাশা—দলের পদ-পদবি, মনোনয়ন ও সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ত্যাগ, সততা, জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হোক।

কারণ দল যদি কেবল নির্বাচনের সময় সক্রিয় হয় এবং দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মীদের পরিবর্তে হঠাৎ আবির্ভূত ব্যক্তিদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নতুন করে আত্মজিজ্ঞাসা

২০২৬ সালের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ১ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ৫ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভার কর্মসূচি রয়েছে। পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও মাছ অবমুক্তকরণের কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিএনপি তার প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা শুধু সমাধিতে ফুল দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, সততা, জাতীয় স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার এবং কর্মমুখী রাজনীতিকে বাস্তবে ধারণ করাই হতে পারে সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।

জিয়ার বাংলাদেশ—আজকের বিএনপি

জিয়াউর রহমানের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দেশকে উৎপাদনমুখী ও আত্মনির্ভরশীল করার চিন্তা। রাজনীতিকে তিনি কেবল ক্ষমতার লড়াই হিসেবে না দেখে রাষ্ট্র ও জনগণের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন—এমন মূল্যায়ন বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক ইতিহাসেও রয়েছে। আজকের বিএনপির সামনে তাই শুধু ক্ষমতায় যাওয়া নয়, বরং কী ধরনের বাংলাদেশ তারা গড়তে চায়—তার সুস্পষ্ট উত্তর দেওয়ার চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

রাজনীতি যদি কেবল পদ, মনোনয়ন, ব্যবসায়িক স্বার্থ কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ প্রশ্নের মুখে পড়বে। আর যদি রাজনীতি জনগণের অধিকার, আইনের শাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠাতার আদর্শের সঙ্গে তার বাস্তব সংযোগ তৈরি হতে পারে।

হাইব্রিড নয়, ত্যাগীদের মূল্যায়ন

বিএনপির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক প্রশ্নগুলোর একটি হতে পারে—দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের কীভাবে যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। রাজনৈতিক দল পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে নতুন মানুষকে গ্রহণ করবে—এটাই স্বাভাবিক। নতুন নেতৃত্বও প্রয়োজন। কিন্তু নতুনদের গ্রহণ করতে গিয়ে পরীক্ষিতদের অবমূল্যায়ন করলে দলের অভ্যন্তরে হতাশা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, কেবল পুরোনো পরিচয়ের কারণে কাউকে নেতৃত্বে রাখতে হবে—এমনটিও নয়। যোগ্যতা, সততা, জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন করাই হতে পারে একটি রাজনৈতিক দলের দীর্ঘমেয়াদি শক্তির ভিত্তি।

সামনে পথ একটাই—আদর্শের কাছে ফিরে যাওয়া

৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসকে নতুন করে মূল্যায়ন করা। জিয়াউর রহমানের নাম শুধু স্লোগানে নয়, তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তব প্রয়োগে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। দলটির নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব যদি ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

অন্যথায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা যতই জাঁকজমকপূর্ণ হোক, ‘জিয়ার বিএনপি’ আর ‘আজকের বিএনপি’র দূরত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। ১ সেপ্টেম্বর তাই শুধু বিএনপির জন্মদিন নয়—এটি দলের জন্য একটি আত্মজিজ্ঞাসার দিনও। জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশ—নাকি ব্যক্তিস্বার্থে বিভক্ত নেতৃত্বের বাংলাদেশ?বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তারা কোন পথ বেছে নেয় তার ওপর।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন