রবিবার
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেপালের বিপন্নতা: হৃদয়ে রক্তক্ষরণ সোমালিয়ার এক বাংলাদেশি ভিসির

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪২ পিএম
এনপিবি গ্রাফিক্স
expand
এনপিবি গ্রাফিক্স

প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে মানুষ কতটা অসহায়, তা আবারও প্রমাণ করল আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। হিমালয়কন্যাসদৃশ শান্ত, সুনিবিড় এই জনপদটি আজ এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে।

গত ২৬ আগস্ট স্থানীয় সময় সকাল আনুমানিক পৌনে ৯টায় নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পার্বত্য অঞ্চলে একটি শক্তিশালী হিমবাহ ধসের (Glacier Collapse) ঘটনা ঘটে।

এর ফলে সৃষ্ট আকস্মিক ও প্রলয়ংকরী কাদা-পাথরের স্রোত এবং ভয়াবহ বন্যা মুহূর্তের মধ্যে লণ্ডভণ্ড করে দেয় নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। দূর আফ্রিকার সোমালিয়ায় বসে, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিজ দাপ্তরিক ব্যস্ততার মধ্যেও, যখনই গণমাধ্যম ও টিভির পর্দায় নেপালের এই মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র দেখছি, আমার অবচেতন মন বারবার ফিরে যাচ্ছে প্রিয় দক্ষিণ এশিয়ার সেই চেনা জনপদে। নেপালি ভাই-বোনদের এই চরম বিপন্নতা ও আর্তনাদ দূর পরবাসে আমার হৃদয়ে গভীরভাবে রক্তক্ষরণ করছে।

ঐতিহাসিকভাবেই নেপাল ভৌগোলিক কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। তবে এবারের বিপর্যয়ের যে ভয়াবহ পরিসংখ্যান সামনে আসছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ করে দিতে বাধ্য।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও নেপাল পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৬শে আগস্টের ওই আকস্মিক দুর্যোগে ইতিমধ্যেই ৪৬৯ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং সহস্রাধিক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে বহু বিদেশি পর্যটক ও স্থানীয় শ্রমিক রয়েছেন।

শত শত ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোটি কোটি ডলার মূল্যের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। যোগাযোগব্যবস্থা, সড়ক ও বিদ্যুৎ গ্রিড সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় উপদ্রুত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে এখনো জরুরি ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো এক দুরূহ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জান-মালের অপূরণীয় ক্ষতি কেবল নেপালের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, এটি সমগ্র মানবতার এক বিশাল ক্ষত।

আমি এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমার গভীরতম সমবেদনা ও আন্তরিক সহমর্মিতা জ্ঞাপন করছি।

যারা স্বজন হারিয়েছেন, যারা নিজের চোখের সামনে প্রিয় মানুষকে ভেসে যেতে দেখেছেন কিংবা যাঁরা মাথার ওপরের ছাদটুকু হারিয়েছেন, তাদের এই সীমাহীন কষ্ট ও মানসিক ট্রমা পরিমাপ করার মতো কোনো দাঁড়িপাল্লা নেই।

সংকটের এই অন্ধকার মুহূর্তে আমি নেপাল সরকার ও দেশটির লড়াকু জনগণের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছি। ইতিহাস সাক্ষী, নেপালি জাতি অত্যন্ত সহনশীল ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ; অতীতের বহু মহামারি ও ভয়াবহ ভূমিকম্পের ক্ষত কাটিয়ে তারা যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এবারও তারা সব বাঁধা ডিঙিয়ে আলোর মুখ দেখবে-এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

তবে এই বিশাল ক্ষত কেবল নেপালের একার পক্ষে নিরাময় করা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম যুগে আজ নেপাল যে সংকটের মুখোমুখি, কাল তা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের ওপরও আঘাত হানতে পারে। তাই এটি আজ আর কোনো একক বা আঞ্চলিক ভৌগোলিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক বিবেকের এক কঠিন পরীক্ষা।

আমি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে, বিশেষ করে জাতিসংঘ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, ওআইসি এবং বিশ্বের বিত্তবান ও মানবিক রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আকুল আহ্বান জানাচ্ছি—আপনারা রাজনীতির সমস্ত সীমানা ও জাতিগত ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে পরম মমতায় এবং উদার হস্তে নেপালের পাশে এসে দাঁড়ান।

এই মুহূর্তে দেশটিতে ব্যাপকভিত্তিক জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও আশ্রয় শিবিরের প্রয়োজন। আসুন, আমরা আমাদের মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে নেপালের এই আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসি। আমাদের সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রয়াসই পারে হিমালয়ের বুকে আবার শান্তির সুবাতাস ফিরিয়ে আনতে, বিষাদের কান্না মুছে শিশুদের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলতে। মানবতার জয় হোক।

লেখকঃ উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন