শুক্রবার
১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস

পরিকল্পিত পরিবার, দক্ষ তরুণ, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ

মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:২০ এএম
মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম
expand
মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম

প্রতি বছর ১১ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। দিবসটি শুধু জনসংখ্যার সংখ্যা নিয়ে ভাবার দিন নয়; বরং জনসংখ্যার গুণগত উন্নয়ন, মানবসম্পদ বিকাশ এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ২০২৬ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য “তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি” বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব, অর্থনীতি, উদ্ভাবন এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ। স্বাধীনতার পর থেকে পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য এবং শিশুস্বাস্থ্য খাতে দেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। জন্মহার হ্রাস, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণে বাংলাদেশ একটি সফল উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যার সংখ্যাগত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনসংখ্যাকে দক্ষ, সুস্থ, শিক্ষিত ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে পরিণত করা।

বর্তমানে বাংলাদেশের একটি বড় অংশ তরুণ জনগোষ্ঠী। এই বাস্তবতা দেশের জন্য একদিকে যেমন বিরাট সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে এটি ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জেও পরিণত হতে পারে। যদি তরুণদের মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবে এই জনসংখ্যাই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করবে। আর যদি তাদের সম্ভাবনা অবহেলিত হয়, তবে বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং অপরাধ বৃদ্ধির মতো নানা সংকট দেখা দিতে পারে।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য মূলত তরুণদের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানায়। একজন তরুণের জন্য শুধু শিক্ষা গ্রহণের সুযোগই যথেষ্ট নয়; তাকে এমন একটি পরিবেশ দিতে হবে যেখানে সে নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে, নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে এবং সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবে। প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে দক্ষতা অর্জন, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং উদ্যোক্তা মানসিকতার বিকাশ তরুণদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি সুস্থ, সচেতন ও পরিকল্পিত পরিবারই একটি সমৃদ্ধ সমাজের ভিত্তি। পরিবার পরিকল্পনা কেবল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পারিবারিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নত জীবন নিশ্চিত করার একটি কার্যকর মাধ্যম। পরিকল্পিত পরিবারে সন্তানরা অধিক যত্ন, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পায়, যা একটি দক্ষ ও মানবিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মাতৃস্বাস্থ্য ও নবজাতকের সুরক্ষাও জনসংখ্যা উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গর্ভকালীন পরিচর্যা, নিরাপদ প্রসব, প্রসব-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও পূর্বশর্ত। একই সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং জীবনদক্ষতা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কৈশোরেই সঠিক তথ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে অল্পবয়সে বিয়ে, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এবং নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

ডিজিটাল যুগে তরুণদের সামনে যেমন অসীম সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি, মানসিক চাপ, ভুয়া তথ্যের বিস্তার এবং অনিরাপদ অনলাইন পরিবেশ তাদের সুস্থ বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। তাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে এমন একটি নিরাপদ ও ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে তরুণরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের বিকশিত করতে পারে।

জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারী শুধু নিজের জীবনমানই উন্নত করেন না, বরং পরিবার ও সমাজের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের ক্ষেত্রেও জনসংখ্যা পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দারিদ্র্য বিমোচন, মানসম্মত শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, লিঙ্গসমতা এবং শোভন কর্মসংস্থানের মতো লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে জনসংখ্যার গুণগত উন্নয়নের বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব না দিলে উন্নয়নের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জনসংখ্যা কোনো বোঝা নয়; সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে এটিই হতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতকের সুরক্ষা, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে একটি সুস্থ, সচেতন, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৬-এ আমাদের অঙ্গীকার হোক প্রতিটি তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন পূরণের সুযোগ নিশ্চিত করা, প্রতিটি পরিবারকে পরিকল্পিত ও সচেতন করে তোলা এবং প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা। আজকের এই প্রত্যয়ই আগামী দিনের সুন্দর, সমৃদ্ধ ও টেকসই বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করবে।

মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম, লেখক ও কলামিস্ট

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
LIVE
France VS Morocco
3'
0 - 0
World Cup