


বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর দ্রুত বিস্তার এবং প্রযুক্তিনির্ভর বৈশ্বিক অর্থনীতির বিকাশ শ্রমবাজারের চাহিদা ও দক্ষতার সংজ্ঞাকে দ্রুত পরিবর্তন করছে। একই সঙ্গে বিশ্ব Industry 4.0-এর বাস্তবায়ন অতিক্রম করে Industry 5.0-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা, অভিযোজন ক্ষমতা, সহযোগিতামূলক নেতৃত্ব এবং দক্ষ মানবসম্পদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় কোনো দেশের প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদ, অবকাঠামো কিংবা আর্থিক মূলধনে নয়; বরং তার দক্ষ, উৎপাদনশীল, উদ্ভাবনী এবং ভবিষ্যৎ-প্রস্তুত মানবসম্পদে। বাংলাদেশের বৃহৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও কার্যক্ষম মানবসম্পদে রূপান্তর করা এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানসমূহের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা আজ সময়ের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নমূলক পেশাগত পরামর্শসেবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং শিল্পায়নের ওপর সরকারের যে গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে ১,৩৬,৬০৬ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব একটি দক্ষ, জ্ঞানভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গঠনের প্রতি সরকারের অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে কর ও ভ্যাট অব্যাহতি, প্রণোদনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানানো প্রয়োজন। কারণ বর্তমান বৈশ্বিক ও জাতীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একদিকে রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং কাজ। প্রস্তাবিত বাজেটে সেই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।
তবে মানবসম্পদ উন্নয়নের বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের স্বার্থে একটি বিষয় আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমানে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, ভাষা শিক্ষা, কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মশালা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক পরামর্শসেবার ওপর ভ্যাট প্রযোজ্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারিভাবে পরিচালিত NSDA অনুমোদিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহও এই ব্যয়ের চাপে প্রভাবিত হয়।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে Skills Gap বা দক্ষতার ঘাটতি। একদিকে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং সেবা খাত দক্ষ কর্মী খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে; অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ-তরুণী উপযুক্ত দক্ষতার অভাবে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শ্রমবাজারে দক্ষতার চাহিদা ও সরবরাহের এই অমিল দূর করতে হলে প্রশিক্ষণ, পুনঃদক্ষতা উন্নয়ন (Reskilling), দক্ষতা উন্নয়ন (Upskilling), ভাষা শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রভিত্তিক শিক্ষার প্রসার অপরিহার্য।
বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য উন্নত দেশে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের ক্ষেত্রে ভাষা শিক্ষা, কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য কারিগরি প্রশিক্ষণের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্পখাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। তাই দক্ষতা উন্নয়নকে ব্যয় নয়, বরং একটি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা সময়ের দাবি।
অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই Human Capital Multiplier Effect (হিউম্যান ক্যাপিটাল মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট)-এর কথা বলে আসছেন। এটি এমন একটি অর্থনৈতিক ধারণা, যেখানে মানুষের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যের পেছনে করা বিনিয়োগ ক্রমান্বয়ে বহুগুণ অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনে। একজন কর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে তার উৎপাদনশীলতা বাড়ে; উৎপাদনশীলতা বাড়লে প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফা বৃদ্ধি পায়; মুনাফা বৃদ্ধি পেলে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং কর-রাজস্বও বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে দক্ষ কর্মী অধিক আয় করে, উন্নত জীবনমান অর্জন করে এবং অর্থনীতিতে আরও বেশি অবদান রাখে।
অন্যদিকে একটি দক্ষ কর্মশক্তি দেশের শিল্প, সেবা ও রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে সহায়তা করে। ফলে মানবসম্পদে বিনিয়োগের সুফল শুধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সরকার, অর্থনীতি এবং সমগ্র সমাজ বহুমাত্রিকভাবে উপকৃত হয়। এ কারণেই উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো মানবসম্পদ উন্নয়নকে ব্যয় নয়, বরং উচ্চ-রিটার্নসম্পন্ন জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে।
এ কারণেই বিশ্বের বহু দেশ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে কর-সুবিধা এবং প্রণোদনার আওতায় নিয়ে এসেছে। সিঙ্গাপুরের SkillsFuture, মালয়েশিয়ার Human Resource Development Fund (HRDF) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো এ ক্ষেত্রে সফল উদাহরণ।
এই প্রেক্ষাপটে বিনীতভাবে কয়েকটি প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে— • প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক পরামর্শসেবার ওপর বিশেষ ভ্যাট সুবিধা বা অব্যাহতি প্রদান; • NSDA অনুমোদিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা অথবা বিশেষ সহায়তা প্রদান; • আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানমুখী ভাষা শিক্ষা, কারিগরি ও কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণকে উৎসাহিত করা; • মানবসম্পদ উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক পরামর্শসেবার জন্য কর-সুবিধা বিবেচনা করা;
• বেসরকারি খাতকে দক্ষতা উন্নয়নে অধিক বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য নীতিগত সহায়তা প্রদান। এ ধরনের পদক্ষেপ সরকারের রাজস্ব আয়ের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে আরও বৃহৎ অর্থনৈতিক সুফল অর্জনের একটি বিনিয়োগমুখী কৌশল। দক্ষ জনশক্তি, উচ্চতর উৎপাদনশীলতা, অধিক রেমিট্যান্স, শক্তিশালী শিল্পখাত, সম্প্রসারিত করভিত্তি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ, উৎপাদনশীল এবং বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক মানবসম্পদে রূপান্তর করা। সরকারের ইতোমধ্যে গৃহীত প্রশংসনীয় উদ্যোগগুলোর সঙ্গে যদি প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক সেবার জন্য আরও সহায়ক নীতিগত ব্যবস্থা যুক্ত হয়, তবে একটি দক্ষ, কর্মসংস্থানমুখী এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের পথ আরও সুগম হবে।
জাতীয় উন্নয়নের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত—“মানুষে বিনিয়োগই সর্বোত্তম বিনিয়োগ।” কারণ দক্ষ মানুষই উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে, উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী অর্থনীতি নির্মাণ করে, আর শক্তিশালী অর্থনীতিই টেকসই রাজস্ব, কর্মসংস্থান এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নিশ্চিত করে।
অতএব, প্রস্তাবিত বাজেটে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক পরামর্শসেবার ওপর বিদ্যমান ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা সময়ের দাবি। এটি কোনো বিশেষ খাতকে অযৌক্তিক সুবিধা প্রদান নয়; বরং মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি দূরদর্শী নীতি উদ্যোগ। স্বল্পমেয়াদে কিছু রাজস্ব সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ জনশক্তি, অধিক কর্মসংস্থান, উচ্চতর উৎপাদনশীলতা, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং সম্প্রসারিত করভিত্তির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতি বহুগুণে উপকৃত হবে। তাই প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক পরামর্শসেবাকে উৎসাহিত করার জন্য সহায়ক করনীতি প্রণয়ন কেবল একটি খাতের দাবি নয়; বরং একটি দক্ষ, উৎপাদনশীল, প্রতিযোগিতামূলক এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের জাতীয় প্রয়োজন।
মো. মাশেকুর রহমান খান
সভাপতি, বিএসএইচআরএম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরামর্শক, পিটিডিসিএ