

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে ‘মব জাস্টিস’ (উচ্ছৃঙ্খল জনতার আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া) এবং গণপিটুনির প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন কর্তব্যরত সাংবাদিক, বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। সরকারের বারবার আশ্বাস এবং ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে এই মব কালচার বা উন্মত্ত জনতার সহিংসতা থামানো যাচ্ছে না।
মানবাধিকার সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা এবং সামাজিক অসহনশীলতাই এই সংকটের মূল কারণ।
পরিসংখ্যান: সাংবাদিক ও মব সহিংসতা নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক বার্ষিক ও মাসিক প্রতিবেদনে দেশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।
সাংবাদিকদের ওপর চড়াও মব: মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে অন্তত ৫৩৯ জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হত্যা, শারীরিক নির্যাতন, লাঞ্ছনা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে রাজনৈতিক উসকানি বা মব সৃষ্টির মাধ্যমে সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি হামলার ঘটনা ঘটছে। এমনকি দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যম ভবনেও মব তৈরি করে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
মব সহিংসতায় মৃত্যুর মিছিল: বিভিন্ন মানবাধিকার সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকেই প্রতি মাসে মব জাস্টিসের ঘটনা বাড়ছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে মব সহিংসতায় যেখানে ১৯ জন নিহত হয়েছিলেন, এপ্রিল মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ জনে। শুধু গত এক বছরেই ১৬৮ জন মানুষ এই গণপিটুনি ও মব সহিংসতার কারণে প্রাণ হারিয়েছেন, আর আহত হয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ।
রাজনৈতিক ঢাল ও প্রশাসনের বক্তব্য': দেশের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে মব তৈরি করে তাৎক্ষণিক হেনস্তা বা চাকরি ছাড়তে বাধ্য করার নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক মহল এই মবগুলোকে এক ধরনের 'জনগণের প্রতিক্রিয়া' বলে হালকা করার চেষ্টা করলেও, সুশীল সমাজ একে গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য এক বড় হুমকি বলে মনে করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্যমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারকেরা দফায় দফায় স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছেন: "দাবি-দাওয়ার নামে কোনো ধরনের মব কালচার বরদাশত করা হবে না। মানুষের গণতান্ত্রিক উপায়ে দাবি জানানোর অধিকার নিশ্চিত করা হবে, তবে মবের মাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে নিলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
একইভাবে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও মব জাস্টিস বন্ধের জন্য এবং আইনশৃঙ্খলার দ্রুত উন্নতির জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সংকটের মূল কারণ ও উত্তরণের পথ: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনকে ব্যবহার করার যে চর্চা ছিল, তা বর্তমানে বিশৃঙ্খল জনতা নিজেদের মতো করে প্রয়োগ করার চেষ্টা করছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সংস্কার প্রক্রিয়া চলমান থাকায় মাঠপর্যায়ে পুলিশের মনোবল এবং কার্যকর ভূমিকার অভাব এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: আইনের কঠোর প্রয়োগ: মব তৈরি করে যারা সাংবাদিক বা সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হচ্ছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
গণমাধ্যমের সুরক্ষা: স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ সেল গঠন করা প্রয়োজন।
সামাজিক প্রতিরোধ: প্রতিটি এলাকায় রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের নিয়ে মব কালচারের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
উন্মত্ত জনতার এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি যদি এখনই শক্ত হাতে দমন করা না যায়, তবে দেশের বাকস্বাধীনতা ও সাধারণ নাগরিকের জীবনযাত্রা চরম অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। লেখক: মোঃ অলি উদ্দিন মিলন, সাংবাদিক।