শুক্রবার
০১ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
০১ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিকের মর্যাদা

শেখ ফরিদ উদ্দিন
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম
শেখ ফরিদ উদ্দিন।
expand
শেখ ফরিদ উদ্দিন।

আজ ১ মে। মহান মে দিবস। আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। মে দিবসের ইতিহাস শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের এক রক্তঝরা সংগ্রামের কাহিনি। মানব রচিত সমাজব্যবস্থার বহু পূর্ব থেকেই ইসলাম শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিকের মর্যাদা নিয়ে বিশদ আলোচনার পূর্বে বিশ্ব শ্রমিক দিবস বা মে দিবসের বিস্তারিত ইতিহাস ও পালনের সময়কাল তুলে ধরা হলো:

১. মে দিবসের প্রেক্ষাপট ও উৎপত্তির ইতিহাস:

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শিল্পবিপ্লবের ফলে কল-কারখানার শ্রমিকদের কাজের কোনো সুনির্দিষ্ট সময় ছিল না। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা, এমনকি কখনো কখনো ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অমানবিক পরিবেশে শ্রমিকদের কাজ করতে হতো। এর বিনিময়ে তাদের দেওয়া হতো সামান্য মজুরি।

এই অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের বিদ্রোহ:

শিকাগোর আন্দোলন (১৮৮৬): শ্রমিকরা দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের ‘হে মার্কেটে’ এক বিশাল ধর্মঘটের ডাক দেয়। প্রায় ৩ লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ বন্ধ করে রাজপথে নেমে আসে।

রক্তক্ষয়ী সংঘাত (৩ ও ৪ মে): ৩ মে শিকাগোর ম্যাককরমিক রিপার কারখানার সামনে পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক হতাহত হন।

এর প্রতিবাদে ৪ মে হে মার্কেটে এক বিশাল জনসভা চলাকালে পুলিশের ওপর একটি বোমা নিক্ষিপ্ত হয়। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করলে অন্তত ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন এবং বহু মানুষ আহত হন।

বিচারের প্রহসন ও ফাঁসি: আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে আগস্ট স্পাইসসহ ৮ জন শ্রমিক নেতাকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর ৪ জন শ্রমিক নেতাকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়।

২. কবে থেকে মে দিবস পালন শুরু হয়েছে?

মে দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিকভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১৮৮৯ সালে।

১৮৮৯ সাল: প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কংগ্রেসের বৈঠকে ১ মে-কে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়।

১৮৯০ সাল: বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।

১৮৯১ সাল: দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেস থেকে প্রতি বছর দিনটি পালনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে।

ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিকের মর্যাদা

শ্রমিকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলামে অনেক কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। মানব রচিত সমাজব্যবস্থায় শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৪০০ বছর আগেই ইসলাম শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। মানবতার মুক্তির দূত ও শান্তির বাহক, মহান আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—সমাজের ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, দুর্বল-সক্ষম সবার সমন্বয়ে এবং একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে একটি সুখময়, শান্তির পৃথিবী।

সমাজের সবাইকে একই অবস্থায় না রেখে, বরং একে অপরের ওপর নির্ভরশীল করে দিয়ে আল্লাহ পাক পৃথিবীর সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। প্রত্যেকের জন্য অন্যের ওপর কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এর ফলে পৃথিবীতে অবস্থানকালে মানুষ দুনিয়ার জীবন ও আখিরাতের সফলতা অর্জনে সক্ষমতা লাভ করতে পারে—এমনটাই নির্দেশ করেছেন মহানবী (সা.)।

ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিকের মর্যাদা বা শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসের আলোকে কিছু দিক নিম্নে তুলে ধরা হলো:

১. শ্রমিকের মর্যাদা ও সাম্যের ভিত্তি: কুরআন মজিদের আলোকে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে ধনী-দরিদ্রের যে বিভাজন করেছেন, তা একপক্ষকে অপরপক্ষের ওপর জুলুম করার জন্য নয়; বরং একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতার জন্য। সূরা আজ-জুখরুফ (৩২) এবং সূরা আল-বাকারা (২৫১)-এ এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

২. শ্রমিকের নিয়োগ ও মজুরি নির্ধারণ: রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, কোনো শ্রমিকের কাছ থেকে কাজ নেওয়ার আগেই তার মজুরি নির্ধারণ করে দিতে হবে। মুসনাদে আহমদের হাদিস (১১৫৮২) অনুযায়ী, এটি শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার প্রথম শর্ত।

৩. শ্রমের বোঝা ও ভ্রাতৃত্ববোধ: সহিহ বুখারির ৬০৫০ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, শ্রমিকরা আমাদেরই ভাই। তাদের ওপর এমন কোনো কাজ চাপানো যাবে না, যা তাদের সামর্থ্যের বাইরে। যদি কোনো ভারী কাজ দিতেই হয়, তবে মালিককে নিজেও তাকে সাহায্য করতে হবে।

৪. সময়মতো পারিশ্রমিক ও মানবিক আচরণ: ইবনে মাজাহ-এর বিখ্যাত হাদিস (২৪৪৩) অনুসারে, শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার পাওনা পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া অধীনস্থদের সঙ্গে কোনোভাবেই গালমন্দ বা গালিগালাজ করা যাবে না। রাসূল (সা.) কাজের লোককে দিনে সত্তরবার ক্ষমা করার নির্দেশ দিয়েছেন।

সবশেষে বলতে চাই, একে অপরের ওপর নির্ভরশীল এই পৃথিবীতে ইসলামের নির্দেশনামতো প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সচেষ্ট থাকি—তাহলেই এই পৃথিবী একটি সুখময় বাসস্থানে পরিণত হবে।

শেখ ফরিদ উদ্দিন লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন