শনিবার
১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজনীতি: নীতি-আদর্শের সেবা নাকি পকেট ভরার হাতিয়ার?

মো. অলি উদ্দিন মিলন
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম
এআই দিয়ে তৈরি ছবি
expand
এআই দিয়ে তৈরি ছবি

‘রাজনীতি মানেই নীতি ও আদর্শ’ এই ধ্রুব সত্যটি বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন। রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনকল্যাণের মহান ব্রত নিয়ে রাজনীতির যাত্রা শুরু হলেও, একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসে অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতি পরিণত হয়েছে ব্যক্তিগত আখের গোছানোর হাতিয়ারে।

তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় সর্বত্রই এখন প্রশ্ন উঠছে: রাজনীতি কি আসলেও জনসেবা, নাকি দ্রুত বিত্তবান হওয়ার কোনো শর্টকাট পথ?

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় রাজনীতি হলো জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার একটি পবিত্র প্রক্রিয়া। একজন জনপ্রতিনিধি যখন কয়েক হাজার মানুষের ভোটে নির্বাচিত হন, তখন তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং হাজারো পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষার ‘আমানতদার’।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, সেই আমানত রক্ষার চেয়ে ক্ষমতার দাপট প্রদর্শনই অনেকের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনসেবার আড়ালে সিন্ডিকেট তৈরি, টেন্ডারবাজি এবং খাস জমি দখলের মতো অভিযোগগুলো এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে এক শ্রেণির মানুষের কাছে রাজনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বিনিয়োগের মাধ্যম’। নির্বাচনের আগে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয় মূলত পরে তার বহুগুণ উসুল করার লক্ষ্য নিয়ে।

জনগণের ট্যাক্সের টাকা এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ যখন জনকল্যাণে ব্যয় না হয়ে প্রভাবশালী নেতাদের পকেটে যায়, তখন রাজনীতির মূল ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এই ‘ব্যবসায়িকীকরণ’ কেবল নৈতিক অবক্ষয়ই ঘটাচ্ছে না, বরং সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের রাজনীতি থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

​পেশিশক্তি ও সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধরাজনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হওয়ার কথা ছিল সহনশীলতা এবং ন্যায়ের পক্ষে আপসহীন অবস্থান। অথচ বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষ যখন তাদের ন্যায্য অধিকার বা সুশাসনের দাবি তোলে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই পেশিশক্তি বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এটি গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বাংলাদেশের মানুষ বরাবরই অধিকার সচেতন। তারা সাময়িকভাবে নীরব থাকলেও যখন পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন ব্যালট মাধ্যমে জবাব দিতে ভুল করে না।

বিগত বিভিন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন প্রমাণ করেছে যে, জনগণের ভালোবাসা ছাড়া কেবল ক্ষমতার জোরে টিকে থাকা অসম্ভব। যারা ভোটারদের তুচ্ছজ্ঞান করেছেন, সময় তাদের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতে দ্বিধা করেনি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সচেতন নাগরিকদের দাবি-রাজনীতিকে শখের বিষয় বা রাতারাতি বড়লোক হওয়ার সিঁড়ি বানানো বন্ধ করতে হবে। রাজনীতির মঞ্চে এখন এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যারা: ​ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে জনস্বার্থকে স্থান দেবেন। ​

দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়াবেন।​ক্ষমতাকে ভোগের বস্তু না ভেবে পবিত্র ‘আমানত’ মনে করবেন।

পরিশেষে, রাজনীতি না বুঝে বা নীতি বিসর্জন দিয়ে যারা ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখেন, তাদের সমাজ থেকে বর্জন করার সময় এসেছে। যে রাজনীতি মানুষের চোখে জল আনে, তা কখনোই টেকসই হতে পারে না।

প্রকৃত রাজনীতিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ি নয়, বরং সাধারণ মানুষের নিঃস্বার্থ দোয়া ও ভালোবাসা। বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতি হোক নীতি-আদর্শের, পেশিশক্তির নয় এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন