শনিবার
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাধারণ নির্বাচন নয়, গণভোটই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ

মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম
expand
মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম

২০২৬ সালের নির্বাচনকে যদি আমরা শুধু আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হিসেবে দেখি, তাহলে একটি বড় ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া হবে। কারণ এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভোটের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি গণভোট—যার গুরুত্ব সাধারণ নির্বাচনের চেয়েও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি। সাধারণ নির্বাচন নির্ধারণ করবে আগামী পাঁচ বছরের সরকার কে হবে; আর গণভোট নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে। এই মৌলিক পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

সাধারণ ভোটে সরকার আসে ও যায়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো—ক্ষমতার ভারসাম্য, সংসদের ভূমিকা, সরকারের জবাবদিহি, সংবিধান পরিবর্তনের সীমা—এসব সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বদলায় না। এগুলো বদলায় কাঠামোগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। গণভোট সেই কাঠামোগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি বিরল সুযোগ।

গণভোটের মাধ্যমে মূলত সিদ্ধান্ত হবে—ভবিষ্যতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে, কতটা নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। সংসদীয় কাঠামোর সংস্কার, রাজনৈতিক দল ও সরকারের মধ্যে ভারসাম্য পুনঃস্থাপন, সুবিধামতো সংবিধান ও বিধান পরিবর্তনের প্রবণতা রোধ—সব মিলিয়ে গণভোট রাষ্ট্র পরিচালনার ‘নিয়ম’ নির্ধারণ করবে, শুধু শাসক নয়। এই কারণেই আমার কাছে গণভোট সাধারণ ভোটের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং অনেক দিক থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে যদি আমরা শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের আন্দোলন হিসেবে দেখি, তাহলে সেটিকে খাটো করা হবে। মানুষ রাস্তায় নেমেছিল শুধু নতুন সরকার চাওয়ার জন্য নয়; তারা নেমেছিল একটি বিকল হয়ে পড়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। সেই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল—ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ বন্ধ করা, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়া এবং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে আর কোনো সরকার সুবিধামতো নিয়ম বদলাতে না পারে। গণভোট সেই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো—অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ সময় ধরে যে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছে, তা কেবল জাতীয় নির্বাচন কবে বা কীভাবে হবে—এই প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চেহারা কেমন হবে, জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন—সেগুলো নির্ধারণ করা।

এই ঐক্যমত্য প্রক্রিয়ার আয়োজক ছিল অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই। ফলে গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়া মানে কেবল একটি মতভেদ নয়; বরং এই সংস্কারপ্রক্রিয়া, জাতীয় ঐক্যমত্য এবং জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের উদ্যোগের বিপক্ষে রায় দেওয়া। অন্যদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া মানে এসব সংস্কার, উদ্যোগ ও ঐকমত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। এই বাস্তবতা থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকা কোনোভাবেই অমূলক বা পক্ষপাতদুষ্ট নয়। বরং এটি তাদের দায়িত্বেরই ধারাবাহিকতা। এই সরকার কোনো প্রচলিত নির্বাচনের ফল নয়; তারা দাঁড়িয়ে আছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বৈধতার ওপর। সেই অভ্যুত্থানের মূল ম্যান্ডেটই ছিল পরিবর্তন—ক্ষমতার নয়, ব্যবস্থার।

এখানেই কিছু কথিত বুদ্ধিজীবীর যুক্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাঁদের মতে, সরকার কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নয় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’র পক্ষে অবস্থান নেওয়া। কিন্তু গণভোট কোনো নিরপেক্ষ একাডেমিক অনুশীলন নয়। এটি একটি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই গণভোটের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে, সেই আন্দোলনে অংশ নিয়েছে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষ—সবাই পরিবর্তনের প্রত্যাশায়। সেই পরিবর্তনের প্রশ্নে নির্লিপ্ত থাকার কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক ভিত্তি নেই।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোটার অংশগ্রহণ। গত প্রায় ১৭ বছরে বাংলাদেশের নির্বাচনে ভোটারদের অনুপস্থিতি একটি গুরুতর সংকটে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে গণভোট ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার একটি বড় প্রণোদনা হতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের একটি বড় অংশ সংসদ নির্বাচনকে ক্ষমতার পুনরাবৃত্তির রাজনীতি হিসেবে দেখলেও গণভোটকে দেখছে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্ন হিসেবে। তারা এতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপ দেখতে পাচ্ছে।

জুলাই অভ্যুত্থান পরিবর্তী দল এনসিপি সতন্ত্র গনভোটের জন্য প্রচারনা ও সেল গঠন করলেও দুঃখজনক হলো, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অনেকেই এখনো গণভোটকে গৌণ হিসেবে দেখছে। তাদের প্রচার-প্রচারণা মূলত আসন, জোট ও ক্ষমতার হিসাবেই সীমাবদ্ধ। অথচ ভোট দুটি একই দিনে, একই কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিই ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে চায়, তাহলে গণভোটকে গুরুত্ব দেওয়া শুধু রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বাস্তব কৌশলগত প্রয়োজনও।

২০২৬ সালের নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের মুহূর্ত নয়; এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি সন্ধিক্ষণ। সাধারণ ভোট সরকার আনবে, কিন্তু গণভোট ঠিক করবে সেই সরকার কতটা ক্ষমতাবান হবে, কতটা জবাবদিহিমূলক হবে এবং রাষ্ট্রের ভারসাম্য কোথায় দাঁড়াবে। এই কারণেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া জরুরি। এটি কোনো দলীয় অবস্থান নয়; এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ও নৈতিক পরিণতি। জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সমঝোতা, রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার যে প্রয়াস—সব কিছুর সঙ্গেই ‘হ্যাঁ’ ভোট অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

গণতন্ত্র কেবল ভোটে টিকে থাকে না; গণতন্ত্র টিকে থাকে সঠিক নিয়মে। ২০২৬ সালের গণভোট সেই নিয়ম নতুন করে লিখে দেওয়ার সুযোগ। সেই সুযোগ হাতছাড়া করা মানে শুধু একটি সিদ্ধান্ত নয়—একটি সম্ভাবনাকেও হারানো।

লেখক: মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X