বৃহস্পতিবার
১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনাই প্রধান চ্যালেঞ্জ

মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম
মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম
expand
মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে এলেই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে রাজনৈতিক সমীকরণ ও সম্ভাব্য ফলাফল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ভিন্ন—ভোটাররা আদৌ ভোটকেন্দ্রে যাবেন কি না।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে। তাঁর ভাষায়, আগের নির্বাচনগুলোতে যারা ভোট দিতে যাননি, তাদের ভোটকেন্দ্রে আনাটাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

এই বক্তব্য বাংলাদেশের গত প্রায় ১৭ বছরের নির্বাচনী অভিজ্ঞতার একটি বাস্তব স্বীকৃতি। এ সময়ের মধ্যে একাধিক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সীমিত ও প্রশ্নবিদ্ধ। কোথাও ভোটকেন্দ্র ফাঁকা ছিল, কোথাও ভোটার উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন হয়েছে, সরকার গঠিত হয়েছে, কিন্তু গণতন্ত্রের মূল শক্তি—জনসম্পৃক্ততা—ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।

ভোটাররা কেন নির্বাচন থেকে দূরে সরে গেছেন, তার কারণ একাধিক। অনেকেই মনে করেছেন, ভোটের ফল আগেই নির্ধারিত। কেউ সহিংসতা, ভয়ভীতি বা অস্থিরতার আশঙ্কায় ভোটকেন্দ্রে যেতে চাননি। আবার নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে একটি পুরো প্রজন্ম গড়ে উঠেছে, যারা কখনও ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেনি। ইইউ রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে সেই বাস্তবতার প্রতিফলন স্পষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের আগে বড় রাজনৈতিক জোটগুলোর প্রকাশিত ফরমায়েশি জরিপ ভোটারদের অনাস্থাকে আরও ঘনীভূত করে। এসব জরিপ অনেক সময় জনমত প্রতিফলনের বদলে রাজনৈতিক বার্তা প্রচারের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এতে ভোটারদের মনে এই ধারণা আরও দৃঢ় হয় যে ভোট দেওয়া বা না দেওয়া—দুটির মধ্যেই কোনো বাস্তব পার্থক্য নেই। গণতন্ত্রের জন্য এটি একটি উদ্বেগজনক সংকেত।

নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তাও ভোটার অনুপস্থিতির একটি বড় কারণ। নির্বাচন কবে ও কীভাবে হবে—এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট ও সময়োপযোগী উত্তর না পেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থাহীনতা। যদিও কমিশন তাদের প্রস্তুতি, লজিস্টিক সক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের কথা বলছে, আস্থা কেবল বক্তব্যে নয়, দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক আচরণেই তৈরি হয়।

এই বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনে একটি নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে—একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে ফেরানোর ক্ষেত্রে এই গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের একটি বড় অংশের মধ্যে গণভোট নিয়ে আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক তরুণ এই গণভোটকে ‘পরিবর্তনের সুযোগ’ এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বেশির ভাগই এখনো সংসদ নির্বাচনের বাইরে গিয়ে গণভোট বিষয়ে তেমন সক্রিয় প্রচারণায় নামেনি। তাদের রাজনৈতিক ভাষ্য মূলত আসন, জোট ও ক্ষমতার হিসাবেই সীমাবদ্ধ। এর বিপরীতে এনসিপি আলাদাভাবে গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে, যা তরুণদের একটি অংশের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করছে। এটি স্পষ্ট করে দেয়—গণভোট কেবল সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।

রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিই ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনতে চায়, তাহলে গণভোটকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ ভোট দুটি একই দিনে, একই কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে। অনেক ভোটারের কাছে সংসদ নির্বাচন আকর্ষণহীন মনে হলেও গণভোট তাদের কেন্দ্রে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা রাজনৈতিকভাবে দূরদর্শিতার অভাবই নির্দেশ করবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বক্তব্য তাই দ্বিমুখী বার্তা বহন করে। একদিকে তারা নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি ও একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনার প্রশংসা করেছে এবং বড় পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে তারা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছে—ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা সহজ কোনো প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। ইইউ রাষ্ট্রদূত নাগরিক ভোটার শিক্ষা, জনবিতর্ক এবং গণভোটের তাৎপর্য ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এসব উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভোটার শিক্ষা তখনই অর্থবহ হবে, যখন ভোটার নিশ্চিত হবেন যে তাঁর ভোট নিরাপদ, সঠিকভাবে গণনা হবে এবং নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিফলিত হবে। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল ভোটের দিন বা ভোটের সময় বাড়ানোর মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশ—যেখানে সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ থাকবে, রাষ্ট্রযন্ত্র নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে এবং সহিংসতার আশঙ্কা থাকবে না। নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি ভোটার আস্থা পুনর্গঠনে দৃশ্যমান ও দৃঢ় ভূমিকা রাখতে হবে।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হতে পারে দীর্ঘদিনের ভোটার অনুপস্থিতি কাটিয়ে ওঠার একটি সুযোগ, আবার হতে পারে গণতান্ত্রিক আস্থাহীনতার ধারাবাহিকতার আরেকটি অধ্যায়। ইতিহাসের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো কি ভোটারকে আবার বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে ফিরিয়ে আনতে পারবে? ভোটার ছাড়া নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব, কিন্তু ভোটার ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না।

তাই ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনা কেবল একটি নির্বাচন ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট—দুয়ের মাধ্যমেই যদি নাগরিকের কণ্ঠস্বর সত্যিকার অর্থে প্রতিফলিত না হয়, তবে যত আয়োজনই হোক না কেন, গণতন্ত্রের শূন্যতা থেকেই যাবে।

লেখক: মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X