রবিবার
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৬১ দিনের গুমের ভয়াবহ স্মৃতি শোনালেন সালাহউদ্দিন

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৮ পিএম আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

৬১ দিনের গুমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তার দাবি, চোখ ও হাত বেঁধে একটি মাইক্রোবাসে করে তাকে সীমান্ত পার করে ভারতের শিলংয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে অবস্থার কারণে প্রথমে তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি মনে করেছিল স্থানীয় লোকজন।

শনিবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত একটি প্রদর্শনী ও প্যানেল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে নিজের সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ।

গুমের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, প্রতিটি দিনই ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। দিনের আলো দেখার সুযোগ না থাকায় খাবার দেওয়ার সময় দেখে সময়ের হিসাব করতেন। আর দেয়ালে নখের আঁচড় কেটে কেটে গুনতেন দিনের সংখ্যা।

সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমার গুমের ৬১ দিন... তার যতটা মিনিট, যতটা মুহূর্ত কেটেছে, তার প্রত্যেকটা যদি আমি লিখে রাখতে পারতাম, তাহলে জাদুঘরের সংকলন হতো না কোনো কিতাব।’

তিনি বলেন, প্রায় ৮ ফুট বাই ৪ ফুটের একটি ছোট ঘরে তাকে রাখা হয়েছিল। জায়গাটি অনেকটা কবরের মতো ছিল। সেখানে ছিল একটি পানির কল ও শৌচকাজের জন্য ছোট একটি ছিদ্র। ঘরটিতে দুর্গন্ধের পাশাপাশি বিষাক্ত পোকামাকড়ও ছিল বলে জানান তিনি।

মেঝেতে কম্বল পেতে ঘুমাতে হতো। দেওয়া হয়েছিল পাতলা একটি বালিশ। নিয়মিত খাবার, পানি ও ওষুধ পেলেও অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার সুযোগ ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।

নিজের শারীরিক জটিলতার কথাও গুমকারীদের জানিয়েছিলেন সালাহউদ্দিন। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হৃদ্‌যন্ত্রে স্টেন্ট বসানো, কিডনিসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলতেন, এই পরিবেশে কতক্ষণ বেঁচে থাকবেন, তা তিনি জানেন না। এমনকি মৃত্যুর আশঙ্কায় লাশ পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধও করেছিলেন।

একদিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে খাবার দিতে এসে কোনো সাড়া না পেয়ে তার কক্ষের দরজা খোলা হয়। পরে গামছা দিয়ে টেনে তাকে তুলে আনা হয় বলে জানান তিনি। বুকের তীব্র ব্যথার কথা বললেও সেখানে চিকিৎসক আসার অনুমতি নেই বলে জানানো হয়েছিল।

এর কিছুদিন পরই তাকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। সেদিন সকালে পানি কম পান করতে বলা হলে সালাহউদ্দিনের মনে হয়েছিল, হয়তো তার জীবনের শেষ সময় এসে গেছে।

এরপর মোটা কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে এবং হাত বেঁধে তাঁকে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়। গাড়িতে আরও কয়েকজন ছিলেন বলে ধারণা করেন তিনি। কয়েক ঘণ্টা চলার পর একটি জায়গায় দীর্ঘ সময় গাড়িতে বসিয়ে রাখা হয়। পরে হাঁটিয়ে অন্য একটি গাড়িতে তোলা হয় এবং আবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া হয়।

একপর্যায়ে আশপাশে হিন্দি ভাষায় কথা বলার শব্দ শুনে তার ধারণা হয়, তাকে ভারতের কোনো এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ভোরের দিকে চোখ খুলে দিলে তিনি একটি চৌরাস্তা, ক্যান্টনমেন্ট এলাকা ও বড় মাঠ দেখতে পান। পরে জানতে পারেন, সেটি শিলংয়ের গলফ লিংক এলাকা।

সেখানেই তাকে নির্জন একটি জায়গায় নামিয়ে দিয়ে বলা হয়, ‘ইউ আর ফ্রি নাউ।’

তখন পা ফুলে যাওয়ায় ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলেন না সালাহউদ্দিন। পথচারীদের কাছে সাহায্য চাইলে তার দাড়ি, ময়লা পোশাক ও শারীরিক অবস্থা দেখে অনেকে তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি মনে করেন।

পরে পুলিশ এসে তাকে একটি বিট হাউসে নিয়ে যায়। নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও প্রথমে তার কথা বিশ্বাস করা হয়নি বলে জানান সালাহউদ্দিন। পরে তাকে শিলং সিভিল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে নেওয়া হয় নর্থ ইস্টার্ন ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড সায়েন্সেসে।

সেখানে এক চিকিৎসককে নিজের পরিচয় জানিয়ে বাংলাদেশের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অনুরোধ করেন তিনি। চিকিৎসককে সালাহউদ্দিন বলেছিলেন, তার দেওয়া নম্বরে ফোন করলেই তিনি কে, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।

শেষ পর্যন্ত তার দেওয়া নম্বরে বাংলাদেশে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথমে স্ত্রী ফোন ধরতে না পারলেও বিদেশি নম্বর দেখে পরে কলব্যাক করেন। ফোনে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর স্ত্রীর প্রতিক্রিয়া স্মরণ করে সালাহউদ্দিন বলেন, তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আমি জান্নাত পেয়ে গেছি।’

এই মুহূর্তটিকে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

পরে শিলং সিভিল হাসপাতালে তার চিকিৎসা হয়। চিকিৎসকের মাধ্যমে তার মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছিল বলে জানান সালাহউদ্দিন।

এর মধ্যেই পুলিশের নজরদারির মধ্যে দূর থেকে একটি ভারতীয় টেলিভিশন ক্যামেরায় তার ছবি ধারণ করা হয়। ক্যামেরার দিকে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য তিনি বলেছিলেন, ‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন।’ পরে সেই দৃশ্য বাংলাদেশে প্রচারিত হয়।

এরপর তাকে ভারতে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং ফরেনার্স অ্যাক্টের মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। কয়েক বছর ধরে আদালতে আইনি লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফেরার পথ তৈরি হয় তার।

দেশে ফিরতে পারার পেছনে বাংলাদেশের মানুষ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অবদানের কথাও স্মরণ করেন সালাহউদ্দিন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা দীর্ঘ ফ্যাসিজম থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছেন, বাংলাদেশটাকে মুক্ত করেছেন। গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করেছেন।’

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন