


ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে ঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্বের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো, করদাতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আধুনিক, জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়োজিত রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এটি এনবিআরের দ্বিতীয় রাজস্ব সম্মেলন; এর আগে ২০২৩ সালে প্রথম রাজস্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থাকে এমন জায়গায় নিতে হবে, যেখানে মানুষ এনবিআরকে ভয় করবে না, বরং বিশ্বাস করবে। করদাতাদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করতে পারলে রাজস্ব আহরণ অনেক সহজ হবে। তাই কর আদায়ের ক্ষেত্রে হয়রানি, দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার পরিবর্তে সেবা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রের অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ রাজস্বের ভূমিকা বাড়ানোর ব্যাপারে জোর প্রদান করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ঋণনির্ভর অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে চলা টেকসই নয়। দেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের চাপ কমাতে নিজস্ব রাজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থায়নে বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদকে কাজে লাগাতে হবে। এর জন্য করদাতাদের ওপর কেবল বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করে নতুন করদাতা শনাক্ত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, প্রতিবছর একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়। বরং যাদের কর দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে কিন্তু এখনো করজালের বাইরে রয়েছেন, তাদের শনাক্ত করে করের আওতা বাড়াতে হবে।
এ জন্য ডাটাভিত্তিক ও ডিজিটাল কর প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য করদাতাদের শনাক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
এনবিআরকে ভয় নয়, আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার নির্দেশ
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল এনবিআরের ভাবমূর্তি ও করদাতাদের আস্থার বিষয়টি।
তিনি বলেন, রাজস্ব প্রশাসনকে জনবান্ধব ও ব্যবসাবান্ধব হতে হবে। করদাতাকে কর দিতে গিয়ে যেন দফতরে দফতরে ঘুরতে না হয় এবং কোনো ধরনের হয়রানি বা দুর্নীতির শিকার হতে না হয়—এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
অনলাইনে কর প্রদান আরও সহজ ও স্বয়ংক্রিয় করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে কর প্রশাসনে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে আনা গেলে দুর্নীতি ও হয়রানির সুযোগও কমবে।
রাজস্ব প্রশাসনের বর্তমান দুর্বলতার পেছনে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো রাজস্ব প্রশাসনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে প্রশাসন ব্যবহারের ফলে করদাতা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এখন সেই আস্থা ফিরিয়ে এনে একটি আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত রাজস্ব কাঠামো তৈরি করতে হবে বলে তিনি জানান।
কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি ও ব্যবসার ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী রাজস্ব কর্মকর্তাদের প্রচলিত কর আইন ও বিধিবিধানের বাইরে নতুন নতুন বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের আহ্বান জানান।
তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা অ্যানালিটিক্স, ই-কমার্স, আন্তর্জাতিক করব্যবস্থা, ট্রান্সফার প্রাইসিং, মানি লন্ডারিং ও আর্থিক অপরাধ সম্পর্কে কর্মকর্তাদের জ্ঞান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতের রাজস্ব প্রশাসন পরিচালনার জন্য শুধু প্রচলিত পদ্ধতি জানা যথেষ্ট নয়; প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মকর্তাদেরও নিজেদের দক্ষতা আধুনিকায়ন করতে হবে।
ভ্যাট ব্যবস্থাপনাকেও সহজ, কার্যকর ও বাস্তবসম্মত করার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। রাজস্ব আহরণকে শুধু আইন প্রয়োগ বা এনফোর্সমেন্ট হিসেবে না দেখে করদাতাদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ব্যবসা পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও হয়রানি কমানো গেলে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে—এমন বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
রাজস্ব খাতে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির আশ্বাসও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠান ও দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের ইতিবাচক ধারা প্রমাণ করে এনবিআরের কর্মকর্তাদের সক্ষমতা রয়েছে। দেশপ্রেম ও আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করলে একটি শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
রাজস্ব সম্মেলনে সরকারের চলমান রাজস্ব সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে আসে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, পুরোনো এনবিআরকে ভেঙে রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।
তিনি জানান, রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কারে সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও অংশীদারি। এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি ‘কন্টাক্ট-ফ্রি’ ও ‘ফেসলেস’ রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলা হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। অর্থমন্ত্রী এটিকে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে উল্লেখ করলেও পরিকল্পিতভাবেই এটি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান।
এই লক্ষ্য অর্জনে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর শুধু অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে করের আওতা বাড়ানো, কর অব্যাহতি যৌক্তিক করা, কর ফাঁকি ও কর পরিহার বন্ধ করা এবং অটোমেশনের মাধ্যমে করদাতাদের কমপ্লায়েন্স বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যেও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণনির্ভরতা কমানোর বিষয়টি উঠে আসে। সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হত চায়। উন্নয়নের অর্থায়ন নিজেদের সম্পদ থেকেই করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
এ কারণে রাজস্ব সম্মেলনকে শুধু রাজস্ব আদায়ের হিসাব-নিকাশের জায়গা হিসেবে না দেখে নিজস্ব অর্থায়নে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছেন সরকারসংশ্লিষ্টরা।