শুক্রবার
২৭ মার্চ ২০২৬, ১৩ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
২৭ মার্চ ২০২৬, ১৩ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সড়ক–রেল–নৌপথে দুর্ঘটনার ছড়াছড়ি, প্রকৃত তথ্য নিয়ে ধোঁয়াশা 

মাসুম পারভেজ
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
এনপিবি গ্রাফিক্স
expand
এনপিবি গ্রাফিক্স

ঈদযাত্রায় একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সড়ক, রেল ও নৌপথে শতাধিক ছোট-বড় দুর্ঘটনায় বহু প্রাণহানির ঘটনায় এবারের ঈদযাত্রা রীতিমতো আতঙ্কের রূপ নিয়েছে। তবে এসব দুর্ঘটনায় হতাহতদের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে বিশেষজ্ঞদের।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০০ জন। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে ১৭ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ২৭৪ জন।

একই সময়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে, ১৪ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন ২৮৫ জন। এসব পরিসংখ্যানের পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে।

২০২৩ সাল থেকে নিয়মিতভাবে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য প্রকাশ করছে বিআরটিএ। তবে সংস্থাটি জেলা কার্যালয় ও পুলিশি মামলার ওপর নির্ভর করে তথ্য সংগ্রহ করে থাকে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিআরটিএর কার্যালয়গুলো যানবাহন ও চালকের লাইসেন্স দেয়া, ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন, যানবাহনের মালিকানা বদলির মতো সাধারণ সেবাগুলোই ঠিকমতো দিতে পারে না; সেখানে দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ সংস্থাটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। প্রয়োজনীয় ও দক্ষ জনবলের অভাবে বিআরটিএ দুর্ঘটনায় হতাহতের প্রকৃত তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থ হচ্ছে বলেও মনে করছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. সামছুল হক বলেন, আমরা যদি সত্যিকার অর্থে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে চাই, তাহলে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী হতে হবে, যার ওপর ভিত্তি করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, কতজন হতাহত হয়, কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়—এগুলো না জেনে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্ভব নয়। অধ্যাপক ড. সামছুল হকের মতে, দেশের পরিবহন খাতের দুর্ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এগুলো গভীর ‘সিস্টেমিক’ ব্যর্থতার প্রতিফলন। সড়কের পুরো ব্যবস্থাপনাকে বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক না করলে এ মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয় বলেও তিনি সতর্ক করেছেন। দেশে নিয়মিত দুর্ঘটনার তথ্য প্রকাশ করে আসছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংস্থাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে। বিপরীতে বিআরটিএর তথ্যের প্রধান উৎস ‘পুলিশ কেস’।

তবে বিআরটিএর কাছে অনেক দুর্ঘটনার তথ্য আসে না বলে মন্তব্য করেছেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহের জন্য বিআরটিএর সক্ষমতা খুবই সীমিত। আবার বিআরটিএর কর্মকর্তাদেরও এ বিষয়ে উদাসীন থাকতে দেখা যায়। এসব কারণে সরকারিভাবে দুর্ঘটনার প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে ঈদযাত্রায় ঘটে যাওয়া একাধিক বড় দুর্ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বগুড়ার সান্তাহারে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হন। কুমিল্লায় রেলগেটে বাস-ট্রেন সংঘর্ষে প্রাণ হারান ১২ জন। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় ফেরির পন্টুন থেকে বাস নদীতে পড়ে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর সদরঘাটে লঞ্চে উঠতে গিয়ে দুই লঞ্চের চাপায় দুইজন নিহত হন। সর্বশেষ কুমিল্লায় বাসের ধাক্কায় প্রাইভেট কারের চার যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে।

প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেগুলোর প্রতিবেদন ও সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায় না বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তার মতে, তদন্ত প্রতিবেদনগুলো প্রায়ই ধামাচাপা পড়ে যায় এবং সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ না করলে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এ প্রাণহানি রোধ করা কঠিন হবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন