

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিন রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও দ্রুত সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে তা নিয়ন্ত্রণে আসে। ওইদিন সকালে ঢাকা-৮ আসনের জামায়াত জোটের প্রার্থী, এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসের কর্মী-সমর্থকরাও সেখানে অবস্থান নেন। মুহূর্তের মধ্যেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং কেন্দ্রের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যেই সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে কোনো ধরনের সংঘাত-সহিংসতা ছাড়াই প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে নিরাপদে কেন্দ্র থেকে বের করে আনে। এতে বড় ধরনের অঘটন এড়ানো সম্ভব হয়।
শুধু শাহজাহানপুর নয়, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঢাকা-১৩ আসনেও বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ববি হাজ্জাজ এবং জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হকের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে সেনাবাহিনী দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
ঢাকার বাইরে কুমিল্লা, ফেনী, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, যশোর, বাগেরহাট, ফরিদপুর ও সিলেটের বিভিন্ন কেন্দ্রে উত্তেজনা দেখা দিলে সেনাসদস্যদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। নির্বাচনের দিন সারাদেশে সংঘাত ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সশস্ত্র বাহিনী।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোট ৯ লাখ ৭০ হাজারের বেশি সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমান বাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯, আনসার ও ভিডিপির ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩ এবং চৌকিদার-দফাদারের ৪৫ হাজার ৮২০ জন সদস্য মোতায়েন ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, এবারের নির্বাচনে পেশাদার ও দৃঢ় ভূমিকার মাধ্যমে তা অনেকটাই দূর হয়েছে। এই নির্বাচন সেনাবাহিনীর জন্য এক ধরনের ‘রিহ্যাবিলিটেশন মোমেন্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, এবার সেনাবাহিনী তাদের দায়িত্বের পরিধি, বিচারিক ক্ষমতা ও সদস্যসংখ্যা—সবকিছুতেই নতুন কাঠামোর মধ্যে থেকে পরিপূর্ণ পেশাদারত্ব দেখিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা জনআস্থার জায়গায় নিজেদের ভাবমূর্তি নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আরপিও সংশোধনের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মর্যাদা দেওয়া হলেও ২০০৮ সালের পর তা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এবার আবারও আরপিও সংশোধন করে সশস্ত্র বাহিনীকে সেই ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়। এর ফলে এবারের নির্বাচনে তারা কার্যকরভাবে আইন প্রয়োগ করতে পেরেছে।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেনাবাহিনীর পেশাদার ও নিরপেক্ষ ভূমিকায় শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, এই ভূমিকা শুধু একটি নির্বাচনই নয়, দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
মন্তব্য করুন