

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


গ্যাসলাইটিং (Gaslighting) শব্দটির সাথে আমরা অনেকেই এখন পরিচিত। এটি কোনো শারীরিক নির্যাতন নয়, বরং সম্পর্কের ভেতরে ঘটা চরম এক অদৃশ্য মানসিক অত্যাচার। এই প্রক্রিয়ায় একজন ব্যক্তি অত্যন্ত চতুরতার সাথে অন্য একজন মানুষের মনে তার নিজের স্মৃতিশক্তি, বিচারবুদ্ধি, বাস্তবতা এবং মানসিক সুস্থতা নিয়ে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি করে। সহজ কথায়, যে ভুক্তভোগী (Victim), তাকে বিশ্বাস করানো হয় যে দোষটা তারই ছিল অথবা সে যা দেখছে বা ভাবছে, তা আসলে সত্যি নয়।
গ্যাসলাইটিং কীভাবে কাজ করে? (সাধারণ কিছু লক্ষণ)
গ্যাসলাইটাররা (যারা এই মানসিক অত্যাচার চালায়) কিছু নির্দিষ্ট কৌশল ব্যবহার করে সঙ্গীকে মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলে:
• মিথ্যা বলা: তারা খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে এমন মিথ্যা বলবে যা আপনি সরাসরি দেখেছেন বা জানেন। তাদের বলার ধরণ দেখে এক সময় আপনি নিজেই নিজের চোখ বা কানকে অবিশ্বাস করতে শুরু করবেন।
• বাস্তবতাকে অস্বীকার করা: "আমি এমন কথা কখনোই বলিনি," বা "তুমি বানিয়ে বানিয়ে কথা বলছ"- এমন বাক্য ব্যবহার করে অতীত ঘটনাকে পুরোপুরি অস্বীকার করা।
• আপনার অনুভূতিকে ছোট করা: যখন আপনি কোনো বিষয়ে কষ্ট পাবেন, তখন তারা বলবে- "তুমি বেশি বাড়াবাড়ি করছ," বা "তোমার সেন্স অফ হিউমার এত খারাপ কেন?" এর ফলে ভুক্তভোগী নিজের কষ্টটাকেই অন্যায় মনে করতে শুরু করে।
• ভুলত্রুটি অন্যের ঘাড়ে চাপানো (Projection): নিজের দোষ ঢাকার জন্য উল্টো সঙ্গীকে দোষী সাব্যস্ত করা। যেমন- নিজে সম্পর্কে প্রতারণা বা মিথ্যা বলে সঙ্গীকে সন্দেহবাতিকগ্রস্ত বা 'পাগল' প্রমাণ করার চেষ্টা করা।
• সহানুভূতি ও ভালোবাসার অস্ত্র ব্যবহার: মাঝেমধ্যে তারা হঠাৎ খুব ভালো আচরণ বা প্রশংসা করতে শুরু করে। এতে ভুক্তভোগী বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং ভাবে, "মানুষটা তো এতটাও খারাপ না, হয়তো ভুলটা আমারই ছিল।"
একজন ভুক্তভোগীর মনের অবস্থা কেমন হয়?
এই অদৃশ্য অত্যাচারের শিকার হওয়া মানুষগুলো এক সময় এক ধরণের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায়। তাদের মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়:
১. অনবরত নিজের সিদ্ধান্তকে সন্দেহ করা: "আমি কি ঠিক ভাবছি?"—এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব কখনোই কাটে না।
২. সব সময় ক্ষমা চাওয়া: কোনো ভুল না করলেও সম্পর্কের শান্তি বজায় রাখতে সব সময় নিজেই "দুঃখিত" বলা।
৩. নিজের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা: এক সময় যে মানুষটি অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ছিল, সে নিজেকে সম্পূর্ণ অক্ষম এবং অপদার্থ মনে করতে শুরু করে।
৪. সবকিছু লুকিয়ে রাখা: বন্ধু বা পরিবারের কাছে সম্পর্কের অশান্তি লুকিয়ে রাখা, কারণ তারা ভয় পায় যে সবাই তাকেই দোষী ভাববে।
এই অদৃশ্য অত্যাচার থেকে মুক্তির উপায় কী?
গ্যাসলাইটিং চেনা যতটা কঠিন, এর থেকে বের হওয়া ততটাই জরুরি। নিজেকে মুক্ত করতে এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে:
• বাস্তবতার প্রমাণ রাখুন (Keep Evidence): টেক্সট মেসেজ, ইমেইল বা ডায়েরিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তারিখ ও বিবরণ লিখে রাখুন। যখনই নিজের স্মৃতি নিয়ে সন্দেহ হবে, এই প্রমাণগুলো আপনাকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনবে।
• নিজের অনুভূতিকে বিশ্বাস করুন: কেউ আপনাকে 'বেশি সংবেদনশীল' বললেই আপনি ভুল হয়ে যান না। আপনার খারাপ লাগা বা কষ্ট পাওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং খাঁটি।
• দূরত্ব বজায় রাখুন: যদি বুঝতে পারেন কেউ আপনাকে ক্রমাগত ম্যানিপুলেট করছে, তবে মানসিকভাবে (এবং সম্ভব হলে শারীরিকভাবে) তার থেকে দূরত্ব তৈরি করুন। তর্ক করে একজন গ্যাসলাইটারকে কখনো জেতানো যায় না।
• প্রিয়জন ও বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিন: বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের (Therapist) সাথে কথা বলুন। বাইরের একজন মানুষ আপনাকে পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে দেখতে সাহায্য করবে।
মনে রাখবেন: কোনো সুস্থ ও ভালোবাসার সম্পর্কে দিনের পর দিন নিজের মানসিক সুস্থতা বা যোগ্যতা নিয়ে প্রমাণ দিতে হয় না। আত্মসম্মান এবং মানসিক শান্তি যেকোনো সম্পর্কের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
