

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ডিজিটাল দুনিয়ার তুমুল জোয়ারে আমরা সবাই এখন 'সবসময় কানেক্টেড'। সকালের ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত- সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই রঙিন পর্দার আড়ালে নিজের অজান্তেই এক অদৃশ্য মানসিক ফাঁদ তৈরি হচ্ছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের ঠেলে দিচ্ছে এক অদ্ভুত মানসিক যন্ত্রণার দিকে, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম- 'ফিয়ার অব মিসিং আউট' বা 'ফোমো'। সহজ ভাষায় ‘সবাই কত ভালো আছে, শুধু আমিই বুঝি পিছিয়ে পড়লাম!’ এই মনস্তাত্ত্বিক ভয়।
কেন বাড়ছে এই ভার্চুয়াল উদ্বেগ?
সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ সাধারণত তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সফল এবং আনন্দময় মুহূর্তগুলোই শেয়ার করে। পেছনের হাড়ভাঙা খাটুনি, ব্যর্থতা বা বিষণ্ণতার গল্পগুলো কিন্তু টাইমলাইনে আসে না। আর এই অর্ধেক সত্যি দেখেই আমরা নিজেদের সাধারণ জীবনকে ব্যর্থ ভাবতে শুরু করি।
মনে করুন, একদল বন্ধু কোনো পার্টিতে গেছে, কনসার্টে আনন্দ করছে- সেই মুহূর্তের লাইভ ছবি বা ভিডিও আপনার স্ক্রিনে ভেসে উঠছে। আপনি সেখানে নেই, এই একাকীত্ব এবং আফসোস মুহূর্তেই মন খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় কার ছবিতে কত লাইক পড়ল, কার ফলোয়ার কত বেশি- এই সংখ্যার খেলা আমাদের এক অসুস্থ তুলনার মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
আশ্চর্য বিষয় হল- এই প্ল্যাটফর্ম অ্যালগরিদমগুলো এমনভাবে তৈরি, যা আপনাকে স্ক্রিনে ধরে রাখতে বাধ্য করে। চকমকে জীবনযাত্রা বা জাঁকজমকপূর্ণ ইভেন্টের কনটেন্টগুলোই আপনার সামনে বেশি বেশি আসে, যা আপনার ভেতরের অকারণ আসক্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ফোমো কেবল সাময়িক কোনো মন খারাপ নয়। দীর্ঘদিন ধরে এই অনুভূতি তাড়িয়ে বেড়ালে তা আমাদের ভেতরে বড় ধরণের মানসিক ক্ষতি করতে পারে।
প্রতিনিয়ত নিজেকে অন্যদের চেয়ে কম সফল ভাবার ফলে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বহুগুণ বেড়ে যায়। অন্যের কৃত্রিম জীবনের সাথে তুলনা করতে করতে মানুষ নিজের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, যা একসময় গভীর অবসাদ বা ডিপ্রেশনে রূপ নেয়। নিজের যা আছে তা উপভোগ করার ক্ষমতা হারিয়ে মানুষ এক চরম অসন্তুষ্টির বৃত্তে ঘুরপাক খায়।
অনেকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই ভার্চুয়াল স্ট্যাটাস ধরে রাখতে গিয়ে মানুষ নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ করছে বা ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ছে।
'ফোমো' থেকে বের হওয়ার উপায়
প্রযুক্তি আমাদের জীবনের গতি বাড়িয়েছে সত্যি, কিন্তু এর লাগাম আমাদের হাতেই রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনের প্রতিটি 'পারফেক্ট' পোস্টের পেছনেও আসলে আমাদের মতোই এক একজন সাধারণ মানুষ বাস করেন, যাদের জীবনেও দুঃখ-কষ্ট আছে।
তাই স্ক্রিনের সাজানো দুনিয়ার সাথে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা বন্ধ করাই হবে প্রথম পদক্ষেপ। ভার্চুয়াল জগতের বাইরে এসে নিজের বাস্তব মুহূর্তগুলোকে ভালোবাসতে শেখা এবং নিজের যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাই পারে এই 'ফোমো'র গ্রাস থেকে আমাদের মুক্তি দিতে।
