

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বাংলাদেশে এডিস মশাবাহিত দুই রোগ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ প্রায়ই একসঙ্গে বৃদ্ধি পায়। যেহেতু এই দুই ভাইরাসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো বেশ কাছাকাছি, তাই রোগীরা প্রায়ই বিভ্রান্তিতে পড়েন। প্রথমে ডেঙ্গুর নেগেটিভ ফল আসার পর পুনরায় পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হওয়ার ঘটনা বেশ সাধারণ।
তবে চিকিৎসকদের মতে, বাহক এক হলেও রোগ দুটির উপসর্গ, জটিলতা এবং পরীক্ষার সঠিক সময় ও চিকিৎসায় বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
ডেঙ্গু জ্বর: উপসর্গ ও বৈশিষ্ট্য
জ্বরের মাত্রা: শরীরে অত্যন্ত তীব্র তাপমাত্রা বা উচ্চমাত্রার জ্বর থাকে।
র্যাশ ও চামড়া: জ্বর শুরু হওয়ার চার-পাঁচ দিন পর শরীরে লাল লাল র্যাশ বা গুটি দেখা যায়। তবে এতে চামড়া কালো হয় না।
শারীরিক ব্যথা: শরীরে ব্যথা থাকে, তবে তা চিকুনগুনিয়ার মতো অতটা তীব্র নয়।
রক্তের পরিবর্তন: রক্তের প্লাটিলেট দ্রুত কমে যায়, যার ফলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
জটিলতা ও অঙ্গহানি: রোগী শক সিন্ড্রোমে চলে যেতে পারে। লিভার, হার্ট বা কিডনির মতো অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে (এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু)।
মৃত্যুঝুঁকি: ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে।
অন্যান্য উপসর্গ: বমি হয় এবং রোগীর খাবারে তীব্র অনীহা তৈরি হয়।
চিকুনগুনিয়া জ্বর: উপসর্গ ও বৈশিষ্ট্য
জ্বরের মাত্রা: প্রথমে জ্বর হলেও দুই-তিন দিন পর তীব্রতা কমে যায়। পরবর্তীতে থেমে থেমে ১০২° থেকে ১০৪° ডিগ্রি পর্যন্ত জ্বর আসে।
জয়েন্টে তীব্র ব্যথা: শরীরের প্রতিটি গিঁটে গিঁটে এবং পেশীতে মারাত্মক ব্যথা হয়, যা বাত বা আর্থ্রাইটিসের ব্যথার মতো। এই ব্যথায় হাঁটাচলা ও ওঠা-বসা করা কষ্টকর হয়ে পড়ে বলে একে ‘ল্যাংড়া জ্বর’ও বলা হয়।
হাত-পা ফোলা: আক্রান্ত রোগীর হাত ও পা ফুলে যায়।
র্যাশ: শরীরে র্যাশ বা গুটি সচরাচর হয় না বললেই চলে।
রক্ত ও অঙ্গের অবস্থা: রক্তের প্লাটিলেট কমে না এবং রক্তক্ষরণ হয় না। লিভার, হার্ট বা কিডনির কোনো ক্ষতি হয় না।
ত্বকের পরিবর্তন: চামড়ায় প্রভাব পড়ে; অনেকের গায়ের রঙ কালো হয়ে যায় এবং চামড়া ওঠে।
মৃত্যু ও জটিলতা: এই রোগে মৃত্যুর কোনো ঝুঁকি নেই, তবে দীর্ঘমেয়াদে জয়েন্টের ব্যথা ও অরুচিতে ভুগতে হয়।
সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষা না করলে উভয় রোগ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, জ্বর শুরু হওয়ার প্রথম দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু শনাক্ত করা সম্ভব। এর বিপরীতে, চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার জন্য জ্বর শুরুর অন্তত পাঁচ দিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
এই সময়ের আগে চিকুনগুনিয়ার টেস্ট করলে তা সাধারণত ধরা পড়ে না। চিকুনগুনিয়া শনাক্তকরণের জন্য আইসিটি (ICT) টেস্ট, আরটি-পিসিআর (RT-PCR) এবং সেরোলজি টেস্টের মাধ্যমে ভাইরাসের অ্যান্টিবডি বা আরএনএ পরীক্ষা করা হয়।
এছাড়া রোগের শুরুতে ডেঙ্গু নয় তা নিশ্চিত হওয়া গেলে চিকুনগুনিয়ার ব্যথার তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে পেইনকিলার ব্যবহারের সুযোগ থাকে।
উভয় রোগের ক্ষেত্রেই মূলত ‘সিস্টেমেটিক সাপোর্টিভ কেয়ার’ বা প্রয়োজনীয় উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। জ্বরের চিকিৎসায় সাধারণত প্যারাসিটামল এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে ব্যথার ওষুধ বা পেইনকিলার ব্যবহার করা হয়, যা অবশ্যই চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী হতে হবে।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে প্লাটিলেট ও হিমোগ্লোবিন কমে গেলে রক্ত সংযোজনের প্রয়োজন হতে পারে এবং অঙ্গহানি রোধে বিশেষ নজর রাখতে হয়। অপরদিকে, চিকুনগুনিয়ায় দীর্ঘমেয়াদী জয়েন্ট পেইন কমানোর জন্য ওষুধ ও অনেক সময় থেরাপির প্রয়োজন পড়ে।
উভয় রোগেই রোগীদের দ্রুত পুনরুদ্ধারের জন্য প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার, ডাবের পানি, জুস এবং বিশেষ করে তাজা ফল খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।




