

ছোটপর্দার অভিনেতা জাহের আলভীর স্ত্রী ইভনাথ খান ইকরা মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ধারণা করছেন, ইকরা আত্মহত্যা করেছেন। আজ শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার সময় জাহের আলভী নেপালে শুটিংয়ে ছিলেন। তার আত্মহত্যার খবরে শোকের ছায়া নেমেছে শোবিজ অঙ্গনে।
এদিকে, ইভনাথ খান ইকরার আত্মহত্যার কারণ জানিয়ে ফেসবুকে এক দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন তার বান্ধবী নিলুফা ইয়াসমীন।
পাঠকদের জন্য নিচে নিলুফার সেই পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হল-
ইকরা আমার ইউনিভার্সিটি লাইফের ফার্স্ট ফ্রেন্ড। ও আমার ক্লাসমেট ছিল। ওর আর আমার একই দিনে ক্লাস শুরু হয়। প্রথম দিনই আমি ওর সাথে বসেছিলাম ক্লাসে। ওর বাসা ছিল মোহাম্মদপুর, আর আমি থাকতাম ফার্মগেট।
আসাদগেট থেকে দুজন একসাথে ক্যাম্পাসের বাসে যাওয়া আসা করতাম। আমার বাসে উঠলে মাথা ঘুরাতো এজন্য ইকরার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে থাকতাম সারা রাস্তা। তারপর ইকরা, স্বর্না আর আমার ফ্রেন্ডশিপ শুরু। আমরা তিনজন একসাথে বসতাম অলওয়েজ। সবাই আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করত, আমাদের ক্ষ্যাপাতো তিন ‘ব্রেস্টফ্রেন্ড’ বলে।
ইকরার একটা স্বভাব ছিল যে ও কখনো আমাকে আর স্বর্নাকে অন্য কারো সাথে তেমন মিশতে দিত না। ও চাইতো শুধু ওর ফ্রেন্ড হয়েই থাকি। এই একটা কারনে ইউনিভার্সিটির মাঝামাঝিতে গিয়ে ইকরা আমাদের সাথে না থাকলেও আমাদের আর তেমন স্ট্রং ফ্রেন্ডশীপ গড়ে উঠে নাই ক্লাসে কারো সাথে। ইকরার মোহাম্মদপুরের বাসায় আমি আর স্বর্না গিয়ে থাকছি, আন্টি আমাদের রান্না করে খাওয়াইছে।
গণরুমে প্রথম উঠলাম ১০১ নম্বার রুমে। স্বর্না ছিল ১০২ নম্বার রুমে। তখন ইমু ছিল আমার বেডমেট। ইকরার বাসা ঢাকায় হওয়াতে ওকে গণরুমে সিট দেয়া হচ্ছিল না। আমি হল সুপারকে অনেক রিকুয়েস্ট করে ইকরাকে বানালাম আমার বেডমেট। ইমু দুই সিটের রুম পেয়ে চলে গেল। এরপর আমরা ২০১ নং গণরুমে চলে গেলাম। পাশাপাশি বেডে একটাতে থাকতাম আমি আর ইকরা, আরেক বেডে থাকত স্বর্না আর সানিয়া।
ইকরা ছিল খুব ডেয়ারিং একটা মেয়ে। আমি বা স্বর্না যা করতে পারতাম না দুম করে ইকরা সেটা করে ফেলতো। ইকরা আর আলভি পড়ত রাইফেলসে। স্কুল লাইফ থেকেই ওদের প্রেম ছিল। আলভি মাঝে মাঝে আসতো ক্যাম্পাসে। ইকরা আমার বেডমেট হওয়াতে ইকরা আলভির অনেক কিছুই শেয়ার করত। বিশেষ করে ওদের ঝগড়া হলে ইকরা আমাকে অনেক ম্যাসেজ দেখাত যে ম্যাসেজগুলো দেখে কখনোই আমার মনে হইতো না বিন্দুমাত্র রেসপেক্ট ইকরার প্রতি তার ছিল।
যাইহোক, এরপরের দুই বছরের ঘটনা ক্যাম্পাসের অনেকেই জানে, অনেকেই জানে না। সেসব লিখতে গেলে অনেক বড় হয়ে যাবে পোস্ট। ইকরা কখনো রিক্সা ভাড়া দিত না আমাদের সাথে রিক্সায় উঠলে, কারন ও টাকা সেভ করতো আলভীর সাথে ডেটে যাওয়ার জন্য। একটা মানুষকে পাওয়ার নেশা ওর মধ্যে এতই বেশি ছিল যে পড়ালেখাটা ওর কাছে মুখ্য বিষয় ছিল না। আল্টিমেটলি ইকরা ফেইল করল, রিপিট করল জুনিয়র ব্যাচের সাথে। ততদিনে ইকরা আলভির বিয়ে হয়েছে (কিভাবে বিয়ে হয়েছে তা আমি, স্বর্না, সানিয়া ছাড়া ক্যাম্পাসের হাতে গোনা ২/১ জন জানে হয়তো)।
ইকরা জুনিয়র ব্যাচে যাওয়ার পরে আমাদের সাথে দূরত্ব বাড়ে। ও তখন হলেও থাকত না ঠিকমত। তখন পূজা হলো আমার বেডমেট। ইকরার সাথে আলভির বিয়ের আগেই আলভি একটা রিয়েলিটি শো-এর মাধ্যমে মিডিয়া জগতে পা রাখে। তখনও একবার ওদের সিরিয়াস ব্রেক আপ হইছিল, কেন হইছিলো সেটা আপনারা বুঝলে বুঝ পাতা, না বুঝলে তেজপাতা। অথচ ইকরা ছোটবেলা থেকেই মিডিয়াতে কাজ করত। একুশে টিভিতে মুক্ত খবর পড়ত, আমাকে আর স্বর্নাকে অনেকবার একুশে টিভিতে নিয়ে গেছে।
ইকরা অনেক আগে থেকেই সেলিব্রেটি ছিল। ইকরা চাইলে মিডিয়াতে আরও অনেক উপরে উঠতে পারত। ওর মধ্যে যথেষ্ট ট্যালেন্ট ছিল। ইকরা খুব ভাল করেই জানত মিডিয়া পাড়ায় কি হয়। কিন্তু বিয়ের পরে ওর জগতটা ছিল আলভীকে ঘিরেই এবং আলভীর ক্যারিয়ার সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট সাপোর্ট দিয়ে গেছে। এরপর বাচ্চা হইল। সোস্যাল মিডিয়াতে ওর নিয়মিত সুন্দর সুন্দর পোস্ট, ওদের এনিভার্সারিতে ওদের লাভস্টোরি লেখা, ভিডিও দেখে হাজার হাজার মানুষ প্রশংসা করত। বাট এইসব গল্পের পিছনেও অনেক গল্প ছিল যেগুলো অনেকেই জানত, অনেকেই জানতো না।
আলভীকে বিয়ের ঠিক কয়েকদিন আগেও একবার টিএসসিতে ঝগড়া করার সময়ে ইকরা সেন্সলেস হয়ে গেছিল। ইকরা চাইলেই পারত রিজিককে নিয়ে আলাদা হয়ে যেতে, হয়নি। কারন মেয়েরা আসলে স্বামীর ভাগ কাউকে দিতে চায় না।
আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না তবে এইটুকু বলতে পারি ইকরা সুইসাইড করার মত মেয়ে না। ওর লাইফে অনেক স্ট্রাগল ছিল। যেহেতু ওর বাবা মা আলাদা থাকত। ওর পুরো পৃথিবীতে ওর একটাই মানুষ ছিল আলভি। ওকে শুধু ভাঙতে পারতো এই একটা মানুষ। আমি বা আমরা অনেকেই জানিনা কেন ও এই ছেলের জন্য এত ক্রেজি ছিল। একটা মেয়ে সব ছেড়ে দিয়েছিল শুধু একজনের সাথে হ্যাপি থাকার জন্য। রিজিকের জন্মের পরে ও পুরো সংসারীই হয়ে গেছিল।
ইকরাকে অনেকদিন আগেই মানসিকভাবে মেরে ফেলা হইছিল। শারীরিকভাবে ও নিজেকে মারছে নাকি ওকে মেরে ফেলা হইছে সেটা তদন্ত করা খুব জরুরী। একটা মানুষ সব এক্সপোজ করবে বলে পোস্ট দিলো এরপর সে গলায় ফাঁসি নিলো এটা আপনাদের কাছে রহস্যজনক মনে হয় না? যদিও তদন্ত হবে না জানি। কারন ইকরার ফ্যামিলিতে এমন কেউ নাই যে এসব নিয়ে লড়বে। ওর কোনো ভাই বোনও নাই। ও একমাত্র সন্তান ছিল।
রিজিকের কথা ভেবে ইকরার আরও স্ট্রং থাকা উচিত ছিল। যদিও স্ট্রং মানুষেরাও মাঝে মাঝে স্ট্রং থাকতে পারে না। ১২ বছর আগেই ওর বুঝা উচিত ছিল যে একবারের জন্য বিশ্বাসঘাতক সে সব সময়ের জন্য বিশ্বাসঘাতক। ভালোবাসা দিয়ে কাউকে ভালো করা যায় না এটা ইকরা আজকে জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেল। আরও অনেক কিছুই প্রকাশ্যে আসবে অপেক্ষা করেন।
আমি আর স্বর্না ইকরাকে মাঝে মাঝেই দোষ দিতাম ওর জন্য আমাদের কোনো বেস্ট ফ্রেন্ড হয় নাই বলে। বাট আজকে ইকরা সব দোষত্রুটির উর্ধ্বে চলে গেছে। মানুষ চলে গেলে তার সাথে সুখের স্মৃতিগুলোই বেশি মনে পড়ে।
পূজার এক্সিডেন্টের পরে অনেক দিন সময় লেগেছিল আমার স্বাভাবিক হতে। যদিও ইকরার সাথে শেষ পর্যন্ত পূজার মত এতটা যোগাযোগ ছিল না আমার। কিন্তু ইকরার সাথে আমার অনেক গুড মেমরিজ আছে। শুধু ও নাই এটা মেনে নিতে কষ্ট হইতেছে।
ইকরার আপডেট : কুর্মিটোলা হাসপাতাল থেকে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী হাস্পাতালে নেয়া হচ্ছে। জানাজা হবে ময়মনসিংহতে। ইকরার দেশের বাসায়। আহ ইকরা!
মন্তব্য করুন