


শাড়ি ফেরত না দেওয়া, প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির অভিযোগে অভিনেত্রী তানজিন নাহার তিশার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। তদন্ত শেষে সম্প্রতি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে সংস্থাটি।
তবে পিবিআইয়ের এই প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট নন মামলার বাদী ফ্যাশন ডিজাইনার আয়েশাহ আনুম ফায়যাহ সানায়া। তার দাবি, মামলার তদন্তের সময় হুমকির অডিও রেকর্ডিংসহ বিভিন্ন প্রমাণ তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া হলেও সেগুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
এ কারণে তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
মামলার নথি ও তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির অভিযোগে মামলাটি করেন আয়েশাহ আনুম ফায়যাহ সানায়া।
আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই।
বাদী বলেন, তদন্তের সময় তিনি সাক্ষী, হুমকির অডিও রেকর্ডিংসহ বিভিন্ন প্রমাণ তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দিয়েছেন।
কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেওয়ায় তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে দাবি করেন। আয়েশাহ আনুম ফায়যাহ সানায়া বলেন, ‘মামলার পর আদালতের নির্দেশে পিবিআই তদন্ত করে। আমি সাক্ষী, হুমকির অডিও রেকর্ডিংসহ সব প্রমাণ দিয়েছি। কিন্তু কোনো কারণ উল্লেখ না করে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এতে আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। তাই আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করব।’
বাদীপক্ষের আইনজীবী শুভ্র সিনহা রায় গণমাধ্যমকে জানান, আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতউল্লাহর আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে। ওই দিনই তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করা হবে।
তিনি বলেন, ‘তানজিন তিশার হুমকির অডিও রেকর্ডিং তদন্ত কর্মকর্তাকে শোনানো হলেও তা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। আমরা আদালতে ন্যায়বিচার চাইব। আশা করছি, সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে আদালত মামলাটি পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেবেন।’
মামলার নথি ও পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাদী একজন ফ্যাশন ডিজাইনার। ঢাকার গুলশানের ১২৭ নম্বর রোডে তার একটি ফ্যাশন হাউজ ও স্টুডিও রয়েছে। অন্যদিকে তানজিন তিশা একজন মডেল ও অভিনেত্রী। বিভিন্ন ফ্যাশন ও অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশ নেওয়ার সূত্রে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য তানজিন তিশা তার সাবেক ড্রাইভারের মাধ্যমে বাদীর কাছ থেকে একটি শাড়ি নেন। বাদীপক্ষের দাবি, শাড়িটির মূল্য ছিল ৭৫ হাজার টাকা এবং অনুষ্ঠান শেষে পরদিনই সেটি ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। তবে শাড়িটি আর ফেরত দেওয়া হয়নি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
শাড়িটি ফেরত চেয়ে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিশাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠান বাদী। তবে উভয়ের মেসেঞ্জারের স্ক্রিনশট পর্যালোচনা করে তদন্ত কর্মকর্তা দেখতে পান, তিশা ওই বার্তাগুলো ‘সিন’ করেননি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যস্ততার কারণে তিশা নিয়মিত ফেসবুক মেসেঞ্জার ব্যবহার করতেন না।
এরপর ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল বাদী তিশাকে পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা জানান। ১৮ মে একটি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে তাদের দেখা ও কুশল বিনিময়ও হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ফ্যাশন হাউজের ট্রায়াল রুম ও ব্যক্তিগত বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে আলোচনা এবং মনোমালিন্য তৈরি হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর বাদী আবার তিশাকে মেসেঞ্জারে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার জন্য বার্তা পাঠান। সেখানে প্রায় এক বছর ধরে শাড়িটি ফেরত না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে লোক পাঠিয়ে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
জবাবে তিশা শাড়িটির বিষয়ে জানতে চান। বাদী তখন শাড়িটির ছবি পাঠান। পরে তিশা তাকে মেসেঞ্জারে কল করলেও বাদী তা রিসিভ করতে পারেননি। পরবর্তী কথোপকথনে তিশা শাড়িটির বিষয়টি মনে করতে পারছেন না এবং খুঁজে দেখে জানাবেন বলে জানান।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তিশা জানান, তার সাবেক ড্রাইভারের শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা ফেরত দেননি। ওই ড্রাইভার চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এ নিয়ে শাড়ি ফেরত দেওয়া নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটিও হয়।
এরপর ৭ নভেম্বর বাদী তিশাকে মেসেঞ্জারে ইংরেজিতে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে আগের বার্তাগুলো দেখতে এবং শাড়িটি ফেরত দিতে বলেন তিনি। একই সঙ্গে তাকে হুমকি দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও উল্লেখ করেন।
জবাবে ১০ নভেম্বর তিশা মেসেঞ্জারে বাদীকে ব্যক্তিগত সমস্যা ও পেশাগত বিষয় আলাদা রাখার অনুরোধ করেন। তাদের একসময় ভালো সম্পর্ক ছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, শাড়ির বিষয়ে তার লোকজন ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং বাদীর লোকজন যেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বার্তার পর ১২ নভেম্বর বাদী গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে বিষয়টি জানতে পেরে তিশা গুলশান থানা পুলিশের মাধ্যমে শাড়িটি ফেরত দিতে চাইলেও বাদী তা গ্রহণ না করে মামলা করেন।
পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকালে তানজিন তিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি জানান, বাদীর সঙ্গে একসময় তার খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। এর আগে বাদীর কাছ থেকে আরও শাড়ি নিয়ে পরার পর সেগুলো ফেরত দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। এসব শাড়ির বিনিময়ে তিনি কোনো টাকা নেননি বলেও তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা না হওয়ায় তিশা শাড়িটির কথা ভুলে গিয়েছিলেন। তার আগের ড্রাইভার শাড়িটি ফেরত না দিয়ে চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ায় বিষয়টি জটিল হয়। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে বাদীর ঠিকানা জানার চেষ্টা করেও তা পাওয়া যায়নি বলে তিশা তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান।
মামলার বিষয়টি জানার পর তানজিন তিশা ডাকযোগে শাড়িটি ফেরত পাঠান। নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ তিনি শাড়িটি ডাকযোগে ফেরত পাঠান।
তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, বাদীকে নোটিশ দিয়ে এবং তদন্তের সময় সরাসরি ও মোবাইল ফোনে মামলার অভিযোগের পক্ষে দালিলিক সাক্ষ্য-প্রমাণ দিতে বলা হলেও তিনি কোনো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। অন্যদিকে তিশা শাড়িটি ফেরত পাঠিয়েছেন।
এ কারণে শাড়ি নিয়ে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে মত দেন তদন্ত কর্মকর্তা।
হুমকির অভিযোগের বিষয়েও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর তিশার পাঠানো মেসেজের শেষাংশে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার ঠিকানা জানতে চাওয়া এবং বাদীর সুন্দর জীবন কামনা করা হয়েছিল। ফলে ওই বার্তার মাধ্যমে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সবশেষে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মামলার বাদী ও বিবাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে বাদীর আনা অভিযোগের বিষয়ে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।
তবে পিবিআইয়ের এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট নয় বাদীপক্ষ। তাদের দাবি, মামলায় দেওয়া হুমকির অডিও রেকর্ডিংসহ অন্যান্য প্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। ওই শুনানির পরই মামলাটির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারিত হবে।