বুধবার
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতিতে জড়িত প্রার্থীকে ভোট দেবেন না ৬৭ শতাংশ ভোটার

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম
জনমনের স্পন্দন উন্মোচন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জরিপের ফল প্রকাশ
expand
জনমনের স্পন্দন উন্মোচন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জরিপের ফল প্রকাশ

দুর্নীতিতে জড়িত কোনো প্রার্থী বা দলকে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও ধর্ম-এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ভোট দেওয়ার প্রবণতাও উঠে এসেছে ভোটারদের মধ্যে। কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (CRF) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ (BEPOS)-এর উদ্যোগে পরিচালিত দেশব্যাপী এক নির্বাচনী জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

আজ বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘জনমনের স্পন্দন উন্মোচন’ শীর্ষক প্রতিবেদনের মাধ্যমে এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জরিপের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন প্রফেসর এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ ও ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ভোটাররা কোন কোন বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন—সে বিষয়ে একাধিক প্যারামিটার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার প্রার্থী বা সংশ্লিষ্ট দল কোনোভাবে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কি না, সেটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করছেন।

একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার। উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছেন ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ, কর্মসংস্থানকে ৫৩ শতাংশ এবং নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়েছেন ৫১ শতাংশ ভোটার। ধর্মীয় বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার।

জরিপের নমুনা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জরিপ পরিচালনাকারীরা জানান, এই জরিপে মোট ১১ হাজার ভোটারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে র‍্যান্ডম স্যাম্পলিং পদ্ধতিতে। দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসন ও ৬৪টি জেলা থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

তারা জানান, প্রতিটি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ তথ্য নেওয়া হয়েছে উপজেলা সদর থেকে এবং বাকি ৫০ শতাংশ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে সদর থেকে অন্তত ১০ কিলোমিটার দূরের গ্রামীণ এলাকা থেকে, যেখানে শহুরে সুযোগ-সুবিধা কম এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল। নারী ও পুরুষ উভয় ভোটারকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং ৫০ শতাংশ তথ্য নারী ভোটারদের কাছ থেকে সংগ্রহের শর্ত মানা হয়েছে। কোনো এলাকায় কোনো নারী ভোটার কথা বলতে আগ্রহী না হলে, অন্য বাড়িতে গিয়ে আগ্রহী ভোটারদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বাজার বা জনসমাগমস্থল থেকে একসঙ্গে একাধিক উত্তর সংগ্রহ করা হয়নি বলেও জানানো হয়।

তথ্য সংগ্রহে কভার টুলবক্স ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রশিক্ষিত এনুমারেটরদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। প্রতিটি এনুমারেটরের কাজ সময়ানুযায়ী পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। একজন ভোটারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহে গড়ে প্রায় ২০ মিনিট সময় লেগেছে বলেও জানানো হয়। খুব অল্প সময়ে ধারাবাহিকভাবে তথ্য জমা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের পক্ষপাত বা অনিয়ম না থাকে।

জরিপে দল ও প্রার্থী-এই দুইয়ের গুরুত্ব সম্পর্কেও তথ্য উঠে আসে। এতে দেখা যায়, প্রায় ৩৩ শতাংশ ভোটার দল ও প্রার্থী উভয় বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে দলের পরিচয়ের দিকে কিছুটা বেশি ঝোঁক থাকলেও প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার বিষয়গুলোও ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সংবাদ সম্মেলনে ভোটার উপস্থিতি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে জরিপ বিশ্লেষকরা জানান, জরিপে ৯০ শতাংশের বেশি ভোটার বলেছেন যে তারা ভোট দিতে চান। মাত্র ৮ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন যে তারা এখনো অনিশ্চিত বা ভোটে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। লিঙ্গ, বয়স, শিক্ষা ও বসবাসের স্থানভেদে এই প্রবণতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়নি।

তারা বলেন, অতীতের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি সাধারণত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এটি জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন এবং এতে অনেক অজানা উপাদান রয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ না নেওয়া, দলটির ভোটারদের একটি অংশের নিরুৎসাহিত হওয়া এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ—এসব বিষয় ভোটার উপস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। জরিপ অনুযায়ী ভোট দিতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা বেশি হলেও প্রকৃত অংশগ্রহণ নির্ভর করবে নির্বাচনের শেষ সপ্তাহের পরিস্থিতি, নির্বাচনের দিন পরিবেশ এবং সরকারের ভূমিকার ওপর।

জরিপ বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, এটি নির্বাচনের আগে পরিচালিত সম্ভাব্য শেষ বড় মতামত জরিপ। এর আগে হওয়া একাধিক জরিপের ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, অনিশ্চিত ভোটারদের মধ্যেও অংশগ্রহণের আগ্রহ বাড়ছে, যাকে ‘ল্যাটেন্ট ডিমান্ড’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

জরিপের ফলাফলে সাবেক আওয়ামী লীগ ভোটার এবং ২০০৮ সালের পর প্রথমবার ভোট দেওয়া ভোটারদের দলীয় পছন্দের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। সাবেক আওয়ামী লীগ ভোটারদের প্রায় ৪৮ শতাংশ এখন বিএনপিকে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে, ২০০৮ সালের পর প্রথমবার ভোট দেওয়া ভোটারদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ জামায়াতকে পছন্দ করছেন।

এছাড়া দেখা গেছে, অধিকাংশ ভোটার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীকে গুরুত্ব দেন-এককভাবে অথবা দলের সঙ্গে মিলিয়ে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার প্রার্থীকে বিবেচনায় নেন। এর মধ্যে ৩০ দশমিক ২ শতাংশ শুধুমাত্র প্রার্থীকে ভিত্তি করে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন এবং ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার প্রার্থী ও দল-উভয় বিষয় বিবেচনা করেন।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে আয়োজকরা বলেন, এই জরিপের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভোটারদের অগ্রাধিকার, দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা তুলে ধরা। এতে সরকারের অভিমত বা নির্দিষ্ট কোনো ইস্যু আলাদাভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। বরং ভোটারদের উপলব্ধি ও বাস্তবতা কীভাবে নির্বাচনী প্রচারণা ও রাজনৈতিক কথাবার্তার মাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছে, সেটিই বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X