বৃহস্পতিবার
২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আস-সুন্নাহ হল

জবির ৬৭০ শিক্ষার্থীর স্বপ্নবুননের ঠিকানা

জবি প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৫, ১১:৫১ পিএম
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
expand
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। গত ১০ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে স্বাক্ষর করেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. শেখ গিয়াস উদ্দিন এবং ফাউন্ডেশনের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক সাব্বির আহমদ।

চুক্তি অনুযায়ী, কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রজেক্ট এলাকায় প্রাথমিকভাবে ৭০০ শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় জুলাই মাস থেকে তিন ধাপে মোট ৬৭০ শিক্ষার্থী “মেধাবী প্রকল্প”-এর আওতায় এসেছে।

হলের অভ্যন্তর পরিদর্শনে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের জন্য ইতোমধ্যে চালু হয়েছে বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম— যার মধ্যে রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), আইসিটি, ইংরেজি স্পিকিং-লিসেনিং কোর্স, কুরআন ও দাওয়াহ ক্লাসসহ ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক নানা সেমিনার।

আস-সুন্নাহ হলে প্রতিদিন তিন বেলা ৬৭০ শিক্ষার্থীর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার প্রস্তুত করা হয়। নিরাপদ পানির জন্য স্থাপন করা হয়েছে ২,০০০ লিটারের ট্যাংক। লাইব্রেরিতে একসঙ্গে ৩০০, ক্লাসরুমে ৩৫০ এবং মসজিদে ১৫০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করতে পারেন।

রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ২০০ কম্পিউটারবিশিষ্ট ল্যাব। সকল ক্লাসরুমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদান করা হয়। মেধাবী প্রকল্প পরিচালনায় কর্মরত রয়েছেন ৩২ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী। প্রতি মাসে প্রকল্পে ব্যয় হয় প্রায় ৭০ লক্ষাধিক টাকা, যার মধ্যে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ মাত্র ১০ লক্ষ টাকা।

পুরো ভবনটি ১২৮টি সিসি ক্যামেরা দ্বারা নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রিত। রয়েছে মেটাল ডিটেক্টর, ফিঙ্গার প্রিন্ট মেশিন ও ২৪/৭ ঘন্টা প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা প্রহরী। পাশাপাশি রয়েছে ৩৫ আসনবিশিষ্ট দুটি লিফট, জেনারেটর, ছাদ ব্যবহারের সুবিধা, ক্যান্টিন, স্টেশনারি, ঠাণ্ডা-গরম পানির ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন খাবারের সুবিধা।

শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার জন্য আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের একটি সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ফলে ঢাকার দোলেশ্বর, জুরাইন ও মগবাজার শাখায় শিক্ষার্থীরা ৫০% ছাড়ে চিকিৎসা নিতে পারেন। হলে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও রয়েছে।

প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে ২টি ডাবল ডেকারসহ মোট ৪টি বাসে শিক্ষার্থীরা আস-সুন্নাহ হল থেকে জবি ক্যাম্পাসে যাতায়াত করে।

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এ টি এম হাসনাত হাবিব বলেন, “আস-সুন্নাহ হলে এসে মনে হচ্ছে আমি এক পরিবারের সদস্য। এখানকার শৃঙ্খলা, ভ্রাতৃত্ববোধ, ইসলামী পরিবেশ ও পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশ সত্যিই প্রশংসনীয়। আমি আশা করি এখান থেকে নৈতিকতা ও জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারব।”

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “এখানে শান্তি ও শৃঙ্খলার পরিবেশে দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাওয়া জীবনের অন্যতম আশীর্বাদ। কম্পিউটার ও IELTS কোর্সের সুযোগ আমাকে আরও উদ্যমী করেছে। সহপাঠীদের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক মানসিক প্রশান্তি দেয়।”

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শফিক ইসলাম জানান, “এখানে এসে অগোছালো জীবনটা শৃঙ্খলায় এসেছে। আমরা নানামুখী কোর্সে অংশ নিচ্ছি, যা আমাদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে।”

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের আলি হাসান বলেন, মেধাবী প্রকল্পে সুযোগ পাওয়া জীবনের বড় আশীর্বাদ। এখানকার খাবার, কোর্স ও শিক্ষকদের আখলাক আমাদের অনুপ্রাণিত করছে। আমি চাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক।”

আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, “রুটিনমাফিক পরিবেশে থাকার সুযোগ পাচ্ছি। শুধুমাত্র যাতায়াতের ক্ষেত্রে কিছু অসুবিধা আছে। তবে আশা করি, এই প্রকল্প আমাদের সুন্নাহভিত্তিক যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।”

ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান নাঈম মন্তব্য করেন, “জবির শত অপূর্ণতার মধ্যে আস-সুন্নাহ হল এক আশীর্বাদ। এখানে ইংরেজি, কম্পিউটার, কুরআন ও এআই কোর্স আমাদের দক্ষতা বাড়াচ্ছে।”

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক বলেন, “আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে মেধাবী প্রকল্প চালু হওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত খাবার, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও স্কিল ট্রেনিং নিশ্চিত করা হয়েছে। এই শিক্ষার্থীরা একাডেমিকভাবেও ভালো করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।”

জবি ছাত্র হল-১ এর প্রভোস্ট ও আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান সাদী বলেন, “এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনই প্রথম আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনের উদ্যোগ নেয়। বর্তমানে ৬৭০ জন শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাচ্ছে। এখানকার সেবার মান প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে, শিক্ষার্থীরাও সন্তুষ্ট। আমি আশা করি, এখানকার শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে অত্যন্ত দক্ষ ও স্মার্ট হয়ে বের হবে।”

আস-সুন্নাহ হল শুধু একটি আবাসন নয়; এটি জবির ৬৭০ শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, শৃঙ্খলা ও চরিত্র গঠনের এক মাইলফলক। ইসলামী মূল্যবোধ ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে এই প্রকল্প হয়ে উঠছে এক অনন্য মডেল — যা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও হতে পারে অনুসরণীয়।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Curaçao VS Ivory Coast
Scheduled
26 Jun, 02:00 AM
VS
World Cup