


ঈদুল ফিতর মুসলিমদের সবচেয়ে আনন্দের উৎসবগুলোর একটি। রমজানের দীর্ঘ এক মাস সংযম ও আত্মশুদ্ধির সাধনার পর শাওয়ালের চাঁদ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সমাজে নেমে আসে ঈদের আনন্দ। বিশেষ করে পরিবার থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে এই উৎসব হয়ে ওঠে ঘরে ফেরার, শিকড়ে ফিরে যাওয়ার এবং শৈশবের স্মৃতিকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার এক মূল্যবান সময়।
পড়াশোনার ব্যস্ততার মাঝেও শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কেউ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য অপেক্ষা করে, কেউ আবার শৈশবের স্মৃতি মনে করে আবেগী হয়ে ওঠে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের এমনই কিছু ঈদ ভাবনা তুলে ধরছেন কাউসার আহমেদ।
নাগরিক সংকট কাটিয়ে ঈদ হোক আনন্দময়
পবিত্র রমজানের দীর্ঘ এক মাস আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য ও সংযমের সাধনার পর প্রতি বছরই ঈদুল ফিতর আসে নতুন বার্তা নিয়ে। ঈদের আনন্দের পাশাপাশি কিছু নাগরিক সংকটও বারবার পরিলক্ষিত হয়। যেমন—রমজান ও ঈদে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যা সাধারণ শিক্ষার্থী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ঈদের কেনাকাটাকে চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন খাতের অস্থিরতা; অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো সড়ক দুর্ঘটনা।
আমি চাই, প্রতিটি মানুষ যেন নিরাপদে তার পরিবারের কাছে পৌঁছাতে পারে। সরকার ও পরিবহন-সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ থাকবে—পরিবহন নৈরাজ্য রোধ ও সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা উপহার দেওয়া হোক, যাতে প্রতিটি ঘরে উৎসবের আনন্দ দুশ্চিন্তাহীন ও আনন্দময় হয়।
সাঈদ মুহাম্মাদ সানোয়ার শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ঈদ মানেই পরিবারের সঙ্গে ভালোবাসা, ঐক্য আর আনন্দ ভাগাভাগির এক বিশেষ সময়। সারা বছর আমরা যত ব্যস্তই থাকি না কেন, ঈদের দিনে সবাই এক হয়ে যাই। মা-বাবা, ভাইবোন মিলে যেন এক অন্যরকম সুখের জগৎ তৈরি হয়। মা-বাবা তো সারাজীবন আমাদের সঙ্গে থাকবেন না, তাই তাদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি ঈদ আমাদের জন্য আরও বেশি মূল্যবান।
ঈদের সকালে সবাই নতুন জামাকাপড় পরে মা-বাবাকে সালাম করি, তাদের মুখের হাসি দেখেই মন ভরে যায়। সালামি পাওয়ার সেই ছোট্ট আনন্দটাও যেন হৃদয়ে বড় সুখ এনে দেয়। এরপর সবাই একসঙ্গে বসে বিরিয়ানি, চটপটি খাওয়া, গল্প করা—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই ঈদের আনন্দকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
এখনো আমার পরিবারে সেই ছোটবেলার মতোই ঈদের আনন্দ থাকে—সেই একই উচ্ছ্বাস, একই ভালোবাসা। তবে এবারের ঈদে একটি শূন্যতা থাকবে। আমরা চাচিকে হারিয়েছি। তাকে ছাড়া ঈদটা আগের মতো পূর্ণ মনে হবে না। ঈদের আনন্দের মাঝেও তাকে অনেক বেশি মনে পড়বে। তবুও তার স্মৃতিকে হৃদয়ে রেখে, পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে থাকার এই সময়টাই আমাদের সবচেয়ে বড় শান্তি ও সুখের উৎস।
নুসরাত জাহান হ্যাপী শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাস জীবনে ঈদ: ঘরে ফেরার আনন্দ ও অপেক্ষার অবসান
ঈদ মানেই আনন্দ, সীমাহীন খুশি আর উৎসবের আমেজ। তবে এই আনন্দ আরও গাঢ় হয় তাদের জন্য, জীবনের তাগিদে বা শিক্ষার উদ্দেশ্যে যাদের থাকতে হয় পরিবার থেকে যোজন যোজন দূরে। সারা বছর দূরে থাকার পর ঈদই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন পরিবারের প্রতিটি সদস্য এক ছাদের নিচে মিলিত হয়, ভাগ করে নেয় জমানো ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন আমাদের এনে দেয় এক নতুন ধরনের স্বাধীনতা। কিন্তু এই উন্মুক্ত জীবনে সবকিছুর প্রাচুর্য থাকলেও, দিন শেষে সবচেয়ে বেশি যে অভাবটি অনুভূত হয়, তা হলো পরিবারের। সারাদিনের ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, সিটি, ল্যাব, কুইজ, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা টিউশনের ব্যস্ততায় দিন কেটে যায়। এই যান্ত্রিক রুটিনের ভিড়ে হঠাৎ পরিবারের কথা মনে পড়লেও, চাইলেই সব ছেড়ে ছুটে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। মন খারাপের মেঘ জমলেও তা সরিয়ে রাখতে হয় একাডেমিক বাস্তবতার চাপে।
প্রিয়জনদের থেকে এই দীর্ঘ দূরত্ব ঘুচিয়ে দেয় ঈদের ছুটি। তাই পরিবার ছেড়ে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদের ছুটি নিছক অবসর নয়, বরং এক স্বর্গীয় সুখের নাম। সারা বছরের ব্যস্ততা ও ক্লান্তির পর ঘরে ফেরার এই সুযোগ যেন এক পশলা প্রশান্তির বৃষ্টির মতো। এই সময়েই শেকড়ের টানে আপন নীড়ে ফেরা হয়। আর এই আনন্দকে আরও দ্বিগুণ করে দেয় ঈদের দিনে সিনিয়রদের কাছ থেকে পাওয়া মোটা অঙ্কের ‘সালামি’।
পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত, প্রিয়জনদের সান্নিধ্য ও সালামির উচ্ছ্বাস মিলেমিশে ঈদ হয়ে ওঠে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি। দূরত্বের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ঈদ আমাদের বুঝিয়ে দেয়—পরিবারের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই অমূল্য।
আবির আহম্মেদ শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
পরিবারের সান্নিধ্যেই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য
এক মাসের দীর্ঘ রোজার পর যখন আকাশে ঈদের চাঁদ দেখা যায়, তখন মনে এক অনির্বচনীয় আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। এই ঈদ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের জীবনে সুখ, ভালোবাসা, ত্যাগ ও অসংখ্য স্মৃতির এক অপূর্ব সমাহার।
ঈদের আগের দিন থেকেই ঘরে শুরু হয় এক অন্যরকম ব্যস্ততা ও আনন্দের পরিবেশ।
ঈদের সকাল যেন এক বিশেষ প্রশান্তি নিয়ে আসে। ভোরে উঠে নতুন জামাকাপড় পরা, তারপর অপেক্ষা—কখন আব্বু ও ভাইয়া নামাজ থেকে ফিরবেন। এরপর আমরা সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করি। একসঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা, হাসি—এসব মুহূর্তই আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় যাওয়া, সবার সঙ্গে দেখা করা—এসবের মাধ্যমে সম্পর্কগুলোকে আরও দৃঢ় করে।
পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য। এখানে যেমন আনন্দ আছে, তেমনি আছে আবেগ, দায়িত্ব, ভালোবাসা এবং স্মৃতির গভীরতা। এই দিনগুলোই আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকে, যা আমরা সারাজীবন হৃদয়ে ধারণ করি।
ইসরাত জাহান শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ঈদের আনন্দে পরিবারের টান
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারণে বছরের বেশিরভাগ সময় পরিবার ও প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকতে হয়। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো নিঃসন্দেহে আনন্দের, আর ঈদের সময় সেই সুযোগটি আসে।
ঈদে পরিবারের সান্নিধ্যে এলে আমাদের মধ্যে আবেগঘন সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। হল বা ব্যাচেলর জীবনে খাবার নিয়ে যে সমস্যাগুলো থাকে, বাসায় গেলে তার সমাধান হয়ে যায়।
তবে এই আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের মাঝেও একটি দিক আড়ালে থেকে যায়—যারা পরিবারের বাইরে ঈদ পালন করেন, তারা এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হন। আবার যাদের কোনো প্রিয়জন আর বেঁচে নেই, তাদের জন্য ঈদের সময় সেই শূন্যতা আরও বেশি করে অনুভূত হয়।
মন্তব্য করুন