রবিবার
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মুসলিম নারী

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪১ এএম
সংগৃহীত ছবি
expand
সংগৃহীত ছবি

মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে ফাতিমা আল-ফিহরির নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। নবম শতকে মরক্কোর ফেজ শহরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কারাউইন মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্র, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বের প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ইউনেসকো ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, কারাউইনকে বিশ্বের প্রাচীনতম নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত ও ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই প্রতিষ্ঠান মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

শৈশব ও পারিবারিক জীবন

ধারণা করা হয়, প্রায় ৮০০ খ্রিষ্টাব্দে তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ান শহরে ফাতিমা আল-ফিহরির জন্ম। তাঁর বাবা মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ জীবিকার সন্ধানে পরিবার নিয়ে মরক্কোর ফেজ শহরে চলে আসেন। সেখানে তিনি ব্যবসার মাধ্যমে আর্থিকভাবে সফল হন এবং সন্তানদের শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন।

ফাতিমা ও তাঁর বোন মারইয়াম ছোটবেলা থেকেই আরবি ভাষা, ফিকহ, হাদিসসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে ফাতিমার জীবনে একের পর এক শোক নেমে আসে। তাঁর বাবা, স্বামী ও ভাইয়ের মৃত্যুর পর বিপুল সম্পদের উত্তরাধিকারী হন তিনি ও তাঁর বোন। সেই সম্পদ ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসে ব্যয় না করে ফাতিমা জ্ঞানচর্চা ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি দরিদ্র ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহায়তা করতেন। মানুষের প্রতি তাঁর মমতা ও শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদানের কারণে তিনি ‘উম্মুল বানিন’—অর্থাৎ ‘সন্তানদের মা’—নামে পরিচিতি লাভ করেন।

কারাউইন মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা

৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ফাতিমা আল-ফিহরি ফেজ শহরে কারাউইন মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। নির্মাণকাজের তদারকিতে তিনি নিজেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মসজিদ নির্মাণের সময় তিনি রোজা রাখতেন। নিজের জন্মভূমি কাইরাওয়ানের স্মৃতিকে ধারণ করেই তিনি মসজিদটির নাম রাখেন ‘আল-কারাউইন’।

মসজিদের পাশাপাশি এখানে একটি শিক্ষাকেন্দ্রও গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে এটি ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি আরবি ব্যাকরণ, গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, ইতিহাস, রসায়ন, ভূগোলসহ নানা বিষয়ে জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।

দশম শতাব্দীর দিকে কারাউইনের খ্যাতি উত্তর আফ্রিকার সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে আসতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কারাউইন একটি বৃহৎ ও প্রভাবশালী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্র

কারাউইনকে ঘিরে ফেজ শহর মধ্যযুগে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। শুধু মুসলিম শিক্ষার্থীই নয়, বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের জ্ঞানী ব্যক্তিরাও এই প্রতিষ্ঠান ও এর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

কারাউইনের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে ইবনে খালদুন, ইবনে রুশদ, ইবনুল আরাবি এবং আল-বিতরুজির মতো বিখ্যাত মনীষীদের নামও উল্লেখ করা হয়। তাঁদের জ্ঞানচর্চা ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

ঐতিহাসিক গ্রন্থের ভাণ্ডার

কারাউইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো এর ঐতিহাসিক গ্রন্থাগার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানে বিপুলসংখ্যক দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ক্ষয়ক্ষতি ও অগ্নিকাণ্ডের কারণে অনেক মূল্যবান পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গেলেও গ্রন্থাগারে এখনো বিপুলসংখ্যক প্রাচীন ও দুর্লভ গ্রন্থ সংরক্ষিত রয়েছে।

এসবের মধ্যে কোরআনের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, হাদিসের সংকলন, ইমাম মালিকের ‘মুয়াত্তা’, ইবনে ইসহাকের সীরাতসংক্রান্ত রচনা এবং ইবনে খালদুনের ‘কিতাবুল ইবার’ ও ‘আল-মুকাদ্দিমা’র পাণ্ডুলিপির মতো মূল্যবান নিদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয়। এসব পাণ্ডুলিপি শুধু ইসলামি ইতিহাস নয়, বিশ্বজ্ঞানচর্চার ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

ফাতিমার উত্তরাধিকার

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ফাতিমা আল-ফিহরি ৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর জীবন ও কর্মের প্রভাব তাঁর মৃত্যুর বহু শতাব্দী পরও অটুট রয়েছে। নিজের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদকে শিক্ষার প্রসারে ব্যয় করে তিনি দেখিয়ে গেছেন, একজন মানুষের উদ্যোগ কীভাবে একটি সভ্যতার জ্ঞানচর্চায় দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে।

সময় ও ইতিহাসের নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কারাউইনও রূপান্তরিত হয়েছে। আধুনিক যুগে এটি মরক্কোর উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। তবুও এর ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে ইসলামি শিক্ষা, মূল্যবোধ ও জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য গভীরভাবে যুক্ত।

ফাতিমা আল-ফিহরির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই—তিনি সম্পদকে শুধু ব্যক্তিগত সমৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং তা মানুষের শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কারাউইন তাই শুধু একটি প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি মুসলিম সভ্যতায় শিক্ষা, জ্ঞান ও মানবকল্যাণে নারীর অবদানের এক অনন্য ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস লেখা হয়। কিন্তু ফাতিমা আল-ফিহরির ইতিহাস চাপা পড়ে থাকে। কেন? কারণ তাঁর ধর্ম পরিচয়।

সূত্র: ইন্টারনেট, গুগল, উইকিপিডিয়া

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন