শনিবার
২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য: ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল

হাসিব সরদার, জবি প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৭ পিএম
ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের মূল ফটক
expand
ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের মূল ফটক

একশ নব্বই বছর পূর্বে ১৮৩৫ সালের ১৫ জুলাই যখন পুরান ঢাকার সদরঘাটে ভাড়া করা বাড়িতে 'ঢাকা ইংলিশ সেমিনারি' হিসেবে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখন কেউ হয়তো ভাবেনি এই প্রতিষ্ঠানটিই হয়ে উঠবে বাংলার আধুনিক শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। বাংলাদেশ তথা অখণ্ড ভারতের প্রথম সরকারি স্কুল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল। আজ কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দুই শতাব্দীর এক জীবন্ত ইতিহাস ও গৌরবের এক উজ্জ্বল প্রতীক। প্রতিষ্ঠানটির মূলমন্ত্র, ‘আল্লাহ আমাদের সহায়।’ সূচনালগ্ন থেকেই দেশ ও বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিবর্গের বিদ্যাপীঠ হিসেবে বিদ্যালয়টি স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে আছে।

প্রতিষ্ঠার পর সদরঘাটের ১ নং লয়াল স্ট্রিটে বিদ্যালয়টির শুরুর দিনগুলো ছিল চ্যালেঞ্জিং। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৩৫ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, ১৮৩৬ সালের রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল এবং পাটনা স্কুলের গোড়াপত্তন করে। তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে ঢাকা জেলার কালেক্টর মি. স্কিনার স্কুল গভর্নিং বডির সভাপতি এবং জেলা সার্জন ডা. জেমস টেইলর স্কুল সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তাদের তত্ত্বাবধানেই মূলত এই অঞ্চলের প্রথম সরকারি স্কুল হিসেবে এটি তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

ঢাকা ইংলিশ সেমিনারী থেকেই ১৮৪১ সালে ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে এই স্কুলটি কলেজের সাথে যুক্ত হয়ে 'ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল' নামে পরিচিতি পায়। শিক্ষা বিস্তারের এই ধারাবাহিকতা থেকেই পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পথ প্রশস্ত হয়েছিল।

এই বিদ্যাপীঠের প্রতিটি অংশে জড়িয়ে আছে অনেক ঐতিহ্য ও কৃতি সন্তানদের স্মৃতি। এখান থেকেই শিক্ষা লাভ করেছেন ঢাকার নবাব আব্দুল গণি, বিশ্ববিখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, পদার্থবিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা এবং অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তিরা।

এছাড়াও কবি বুদ্ধদেব বসু, শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, চলচ্চিত্রকার হীরালাল সেন, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক এবং বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমানের মতো মহানায়কদের নাম এই স্কুলের ইতিহাসের সাথে মিশে আছে। তবে এই সুদীর্ঘ পথচলায় স্কুলটিকে প্রতিকূলতার মুখোমুখিও হতে হয়েছে। পাকিস্তান আমলে স্কুলের মূল ভবন সরিয়ে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান করায় শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা স্বাধীনতার পরও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে বিদ্যালয়টি একক প্রশাসনাধীন দুটি পূর্ণাঙ্গ শিফটে পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় ১৯৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন প্রধান শিক্ষক, দুজন সহকারী প্রধান শিক্ষক ও ৫০ জন দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক কর্মরত আছেন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে গুরুত্ব দিয়ে এখানে মাল্টিমিডিয়া পাঠদান, অনলাইন ডাটাবেস এবং আধুনিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি ডিবেটিং ক্লাব, সায়েন্স ক্লাব এবং বিএনসিসির মতো সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধা বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

স্কুলের নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে বর্তমান প্রধান শিক্ষক কবিতা রানি সরকার লিখেছেন, এই দীর্ঘ যাত্রার পেছনে রয়েছে সুদক্ষ নেতৃত্বের ইতিহাস। স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন মিস্টার রিজ, যিনি ১৮৩৫ থেকে ১৮৩৯ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে স্কুলের প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর সুযোগ্য পরিচালনার কারণেই তৎকালীন প্রতিকূল সমাজেও ইংরেজি শিক্ষার প্রসার সম্ভব হয়েছিল। বর্তমানেও সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করে বর্তমান প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকবৃন্দ কাজ করে যাচ্ছেন। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে বিজ্ঞানমনস্ক নাগরিক গঠন এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে স্কুলটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণ করাই এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য। ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠ তার নিজস্ব স্বকীয়তায় আরও শত বছর শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন