শুক্রবার
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আপনার অজান্তেই বিক্রি হচ্ছে কললিস্ট-লোকেশন-এনআইডি, কোথায় চলছে এই কেনাবেচা

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand

আপনি মোবাইল ফোনে কার সঙ্গে কথা বলেছেন, কতক্ষণ কথা বলেছেন, কোন এলাকা থেকে কল করেছেন, এমনকি এই মুহূর্তে আপনি কোথায় আছেন—এসব ব্যক্তিগত তথ্যও এখন টাকার বিনিময়ে অন্যের হাতে চলে যেতে পারে। শুধু তা-ই নয়, পাওয়া যাচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যও।

মাত্র ১ হাজার টাকা দিলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এসব ব্যক্তিগত তথ্য পাওয়ার দাবি করছে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিক্রেতারা। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামেও প্রকাশ্যেই চলছে এসব তথ্যের কেনাবেচা। বেচাকেনায় ব্যবহার করা হচ্ছে বিকাশ, নগদ, রকেট ও উপায়ের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা।

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ব্যক্তিগত তথ্যের এই ভয়ংকর বাজারের চিত্র।

কী কী তথ্য বিক্রি হচ্ছে

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে জানা যায়, এই বাজারে শুধু কললিস্ট বা লোকেশন নয়, আরও নানা ধরনের সংবেদনশীল তথ্য বিক্রির দাবি করা হচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য, ফোন কলের রেকর্ড, মোবাইলের অবস্থান, পাসপোর্টের তথ্য, নির্দিষ্ট নম্বরে পাঠানো এসএমএসের তালিকা, টিআইএন সনদ, জন্ম ও মৃত্যুসনদ, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ এবং মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাবের বিবরণী।

এনআইডির ক্ষেত্রে ভোটার নম্বর, ছবি, জন্মতারিখ, মা-বাবার নাম, ঠিকানা ও স্বাক্ষরসহ বিভিন্ন তথ্য সরবরাহের দাবি করা হচ্ছে।

কলের তথ্যের ক্ষেত্রে জানা যেতে পারে কোনো ব্যক্তি কাকে ফোন করেছেন, কখন ফোন করেছেন, কতক্ষণ কথা বলেছেন এবং কলটি করেছেন নাকি পেয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফোনে ব্যবহৃত সিম ও হ্যান্ডসেটের তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

কত টাকায় মিলছে এসব তথ্য

ডিসমিসল্যাব জানায়, বিভিন্ন ধরনের তথ্যের জন্য আলাদা দাম নির্ধারণ করে রেখেছেন বিক্রেতারা।

এনআইডির পিডিএফ বা সাইন কপি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায়। ১৭ মিনিটের মধ্যে এনআইডির পিডিএফ দেওয়ার জন্য ৫০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে।

কোনো মোবাইল নম্বরের লোকেশন জানাতেও টাকা নেওয়া হচ্ছে। একটি ক্ষেত্রে টাকা দেওয়ার মাত্র ১৬ মিনিটের মধ্যে একটি নম্বরের অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিন মাসের কল রেকর্ডের জন্য চাওয়া হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা। এসব তথ্য দিতে সময় লাগছে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা।

এ ছাড়া বিকাশ হিসাবধারীর এনআইডি ও স্টেটমেন্ট দেওয়ার জন্য ১ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।

১৬ মিনিটেই পাওয়া গেল লোকেশন

ডিসমিসল্যাব একটি গ্রামীণফোন নম্বরের অবস্থান জানতে চেয়ে টাকা দেয়। এরপর মাত্র ১৬ মিনিটের মধ্যে ওই নম্বরের তথ্য পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওয়েবসাইটটি জানায়, নম্বরটি সর্বশেষ কখন সক্রিয় ছিল। একই সঙ্গে মোবাইল টাওয়ারভিত্তিক অবস্থান, একটি ঠিকানা এবং গুগল ম্যাপের লিংকও পাঠানো হয়।

দীর্ঘ সময়ের কল ও লোকেশন তথ্য বিশ্লেষণ করলে একজন ব্যক্তি কোথায় কোথায় চলাফেরা করেছেন, তারও ধারণা পাওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছে ডিসমিসল্যাব।

কোথায় চলছে এই কেনাবেচা

ডিসমিসল্যাব ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপের পোস্ট বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান পেয়েছে।

এ ছাড়া এক মাসে ফেসবুকে তথ্য বেচাকেনার ৬০০টির বেশি পোস্ট খুঁজে পেয়েছে সংস্থাটি।

ওয়েবসাইটগুলোর প্রায় সবগুলোর নকশা ও কার্যক্রমের ধরন একই রকম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, টিআইএন সনদ, কল রেকর্ড ও মোবাইলের অবস্থানের তথ্যের দাম দেওয়া ছিল।

এর মধ্যে অন্তত একটি ওয়েবসাইট ২০২৫ সালে নিবন্ধিত হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছে ডিসমিসল্যাব।

চাঁদপুরের একটি ওয়েবসাইটের মালিককেও শনাক্ত করেছে সংস্থাটি। তিনি মোবাইল ফোন মেরামতের কাজ করেন।

ওই ব্যক্তি জানান, তিনি ৮০০ টাকায় মোবাইল গ্রাহকের কলের তালিকা কিনে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেন। ১ হাজার টাকা দিলে কোনো বিকাশ নম্বর খোলার সময় ব্যবহার করা এনআইডির তথ্য দেওয়া যায় বলেও দাবি করেন তিনি। ৪ হাজার ৫০০ টাকা দিলে বিকাশ হিসাবের বিবরণীও দেওয়া সম্ভব বলে জানান।

কীভাবে ফাঁস হচ্ছে তথ্য

ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজারটির নিচের স্তরের বিক্রেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেন। ক্রেতা যোগাযোগ করলে মধ্যস্বত্বভোগীরা বিকাশ, নগদ, রকেট বা উপায়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে টাকা জমা দেন।

এরপর ওয়েবসাইট থেকে তথ্য কিনে তা আবার হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি দামে বিক্রি করেন তাঁরা।

চাঁদপুরের ওই ওয়েবসাইটের মালিক দাবি করেন, তিনি অন্য একটি গ্রুপের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। ওই গ্রুপ একটি সরকারি সার্ভারের নিরাপত্তাব্যবস্থা পাশ কাটিয়ে এপিআইয়ের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে বলে দাবি করেন তিনি।

ওই বিক্রেতা আরও দাবি করেন, একটি সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মূল ডেটাবেজে এনআইডি ও জন্মতারিখ দিয়ে বিস্তারিত তথ্য খোঁজা যায়। সেখান থেকে এপিআই তৈরি করে তথ্য বিক্রি করা হচ্ছে।

তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি ডিসমিসল্যাব। ওই বিক্রেতা যাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার কথা বলেছেন, তাঁদের পরিচয়ও নিশ্চিত করা যায়নি।

অপারেটরদের ব্যবস্থায় কারা প্রবেশাধিকার রাখে

ডিসমিসল্যাব দুটি মোবাইল অপারেটর ও একজন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কেউ ছাড়া রিয়েল-টাইম তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। অথবা কেউ তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার নিরাপত্তা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেছে।

দুই ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায় রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মোবাইল অপারেটরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডিসমিসল্যাবকে জানান, বিটিআরসি, জাতীয় টেলিযোগাযোগ মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) ও পুলিশ সদর দপ্তরসহ ১০টির বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অপারেটরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার রয়েছে।

এই প্রবেশাধিকার ব্যবহার করে গ্রাহকের বিস্তারিত কল রেকর্ড এবং সিম নিবন্ধনের সময় দেওয়া ব্যক্তিগত তথ্য দেখা ও পর্যবেক্ষণ করা যায়।

ওই কর্মকর্তা জানান, তথ্য ফাঁসের উৎস খুঁজতে অপারেটরটি নিজস্ব তদন্তও করেছে। তদন্তে একটি সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার এপিআই ব্যবহার করে কিছু তথ্য ফাঁসের বিষয়টি পাওয়া যায়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর ওই সংস্থার একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিটিআরসিকেও একাধিকবার বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিন বছর ধরে চলছে

ডিসমিসল্যাব জানায়, গত তিন বছর ধরে প্রকাশ্যে ব্যক্তিগত তথ্যের এই বেচাকেনা চলছে। ২০২৩ সাল থেকেই এমন তথ্য বিক্রির পোস্ট পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।

২০২৫ সালের মার্চে ইউটিউবে প্রকাশিত একটি ভিডিওতেও একই ধরনের সেবা বিক্রির বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়।

২০২৪ সালের এপ্রিলে এনটিএমসি বিষয়টি পর্যালোচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল। ওই চিঠিতে বলা হয়, ৭৮৯টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গ্রুপে মানুষের এনআইডি ও কল রেকর্ড বিক্রি করা হচ্ছে।

তদন্তে পুলিশের অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের একজন পুলিশ সুপার এবং র‍্যাব-৬-এর একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের লগইন তথ্য ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে এসব তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি উঠে আসে।

সাইবার অপরাধ শাখার একজন কনস্টেবল অর্থের বিনিময়ে সংবেদনশীল কল রেকর্ড বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার কথাও স্বীকার করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কী ঝুঁকি তৈরি হতে পারে

কারও এনআইডি, কল রেকর্ড বা অবস্থানের তথ্য অন্যের হাতে চলে গেলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সুমন আহমেদ সাবির বলেন, বাংলাদেশে এনআইডি পরিচয় যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কারও এনআইডির সব তথ্য অন্যের হাতে গেলে তাঁর নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা, পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা করা কিংবা সম্পূর্ণ ভুয়া পরিচয় তৈরি করা সম্ভব।

অন্য কেউ ওই ব্যক্তির নামে ভুয়া আর্থিক বা অবৈধ লেনদেন করেও তাঁকে বিপদে ফেলতে পারে।

এ ছাড়া কারও চলাফেরা ও যোগাযোগের তথ্য অপরাধী বা শত্রুপক্ষের হাতে গেলে ব্ল্যাকমেইল কিংবা অন্য ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।

গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষার বিষয়ে যা বলছে গ্রামীণফোন

গ্রামীণফোন লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছে, গ্রাহকের তথ্য ও ডেটা সুরক্ষাকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। আইন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা ও নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যক্তিদের কাছেই এসব তথ্য দেওয়া হয়।

একটি মোবাইল অপারেটর জানিয়েছে, তারা অনেক আগেই প্রমাণসহ তথ্য বিক্রির বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে। কিন্তু এরপরও তথ্য বিক্রি বন্ধ হয়নি।

আইনে কী আছে

বাংলাদেশের ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন-২০২৬ অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা ব্যক্তিগত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা যাবে না।

কোনো ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘিত হলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে পারবেন। তথ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করলে প্রশাসনিক জরিমানার বিধানও রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এই জরিমানার পরিমাণ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য মেলেনি

ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডিসমিসল্যাব নির্বাচন কমিশন, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন বিভাগ, এনটিএমসি ও জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে।

নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মোমিন সরকার জানান, এ বিষয়ে বক্তব্য পেতে কমিশনে লিখিত আবেদন করতে হবে।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন শাখার মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশাকে পাঠানো প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এনটিএমসির অতিরিক্ত পরিচালকের কাছে ই-মেইলে সাক্ষাৎকারের অনুরোধ পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার মহাপরিচালক মো. তাইবুর রহমানকে প্রশ্ন পাঠালেও কোনো উত্তর দেননি বলে জানিয়েছে ডিসমিসল্যাব।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank