


রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগ ট্রাফিক বিভাগের আওতাধীন ছয়টি থানা এলাকায় যানজট, সড়ক ও ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং, অটোরিকশার দৌরাত্ম্যসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক লালবাগ বিভাগ। সভায় যানজটের চারটি বড় ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে পুরান ঢাকার আজিমপুর নিউ পল্টনে ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-লালবাগ) কার্যালয়ে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে লালবাগ ট্রাফিক বিভাগের ডিসি মো. মফিজুল ইসলাম, এডিসি এহসানুল কামরান তানভীর, লালবাগ জোনের এসি মাহাতাব হোসেন, কোতোয়ালি জোনের এসি একেএম মনজুরুল আলমসহ বিভিন্ন এলাকার টিআই ও সার্জেন্টরা উপস্থিত ছিলেন।
ডিসি মফিজুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয়টি থানা এলাকায় সড়ক দখলমুক্ত ও যানজট নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে পুরোপুরি সমাধানে পুলিশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ঢাকায় অটোরিকশা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকার আইন প্রণয়নসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও জীবিকা বা ছোট ব্যবসা হিসেবে অটোরিকশা নামিয়েছেন। তাদের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়। তবে নিয়মবহির্ভূত ও আইনভঙ্গকারী অটোরিকশার বিরুদ্ধে মামলা, ডাম্পিংসহ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত ডাম্পিং ব্যবস্থা না থাকায় জব্দ করা গাড়ি দীর্ঘদিন আটকে রাখা সম্ভব হয় না। তাই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
চার ‘হটস্পট’
ট্রাফিক বিভাগ ফুলবাড়িয়া, বাদামতলী, ধোলাইখাল ও ভিক্টোরিয়া পার্কসংলগ্ন বাসস্টপ এলাকাকে যানজট ও সড়ক প্রতিবন্ধকতার বড় চারটি স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফুটপাত ও সড়ক দখল, অবৈধ পার্কিং এবং অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে এসব এলাকায় নিয়মিত যানজট হয়।
ডিসি বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। ফুলবাড়িয়ায় বিআরটিসি বাসস্টপ নিয়ে আগেও সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ঢাকার বাইরে বাসস্টপ করার কথা থাকলেও জায়গার সংকটে সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য বর্তমানে সেখানে বাস রাখা হচ্ছে। বিআরটিসির প্রায় ৩৫০টি বাসের তুলনায় পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তাই বাস রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জায়গা দেওয়ার বিষয়টি প্রশাসন ও সরকারকে জানানো হয়েছে।
তিনি জানান, বিআরটিএ থেকে রুট পারমিটের তালিকা নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত অভিযানে গাড়ির হেডলাইটসহ ফিটনেস পরীক্ষা করা হচ্ছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা ও ডাম্পিং করা হচ্ছে।
ছয় মাসে ৩০ হাজার মামলা
ডিসি জানান, গত ছয় মাসে বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে ৩০ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। জরিমানা আদায় হয়েছে ৫৫ লাখ ২৬ হাজার টাকার বেশি। বাসসহ বিভিন্ন পরিবহনের বিরুদ্ধে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, ৩ থেকে ৫ শতাংশ মানুষ আইন না মানলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ আইন অমান্য করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন। তাই মামলা-জরিমানার পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা জরুরি। যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক ও কমিউনিটি পুলিশ কাজ করছে। তবে ট্রাফিক বিভাগে পর্যাপ্ত জনবল সংকট রয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে আজিমপুরের রেন্ট-এ-কার স্ট্যান্ড
সাংবাদিকরা আজিমপুর গোরা শহীদ মাজারসংলগ্ন সড়কে রেন্ট-এ-কার স্ট্যান্ড থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিসি মফিজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে আগেও গণমাধ্যমে সংবাদ হয়েছে। সংবাদ প্রকাশের পর এবং রাস্তা-ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে কয়েকবার স্ট্যান্ডটি সরানো হয়েছে। কিন্তু উচ্ছেদের পর আবার গাড়ি রাখা হচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে, যাতে সেখানে ফের স্ট্যান্ড বসতে না পারে।
বাবুবাজারে সিএনজি নিয়ে প্রশ্ন
বাবুবাজার ব্রিজ এলাকায় দীর্ঘদিনের সিএনজি সমস্যা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিসি বলেন, আগে সেখানে ব্যাপক যানজট থাকলেও গত এক বছর ধরে পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি সিএনজি চলাচল করে, যার অনেকগুলোরই ঢাকার বাইরের নম্বর।
তিনি বলেন, স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন এলাকার মানুষ সেখানে সিএনজি রাখার অনুরোধ করেছেন। বিশেষ করে মিটফোর্ড হাসপাতালে রোগীদের যাতায়াতে পরিবহন সংকট বিবেচনায় সিএনজি রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যদিও আইনগতভাবে সেখানে সিএনজি রাখা নিষিদ্ধ।
ডিসি বলেন, যাত্রী নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা অর্থনৈতিক কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বর্তমানে নির্বাচিত সরকার রয়েছে। তিনি দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত জনভোগান্তি মেনে নেওয়া হবে না এবং সরকারও এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেবে না।
নবাবগঞ্জ সেকশনে লেগুনা নিয়ে প্রশ্ন
সাংবাদিকরা নবাবগঞ্জ সেকশন ঢাল এলাকায় প্রায় দুই শতাধিক অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন লেগুনা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বেপরোয়া চলাচল নিয়ে প্রশ্ন করেন।
লালবাগ জোনের এসি মাহাতাব হোসেন বলেন, এসব লেগুনার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, মামলা ও ডাম্পিং করা হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, অধিকাংশ গাড়িরই ফিটনেস নেই।
তিনি বলেন, এলাকায় সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষ বেশি চলাচল করায় ট্রাফিক পুলিশ মানবিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। অনেক চালককে অপ্রাপ্তবয়স্ক মনে হলেও তাদের ভোটার আইডি ও ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে। ফলে আইনগতভাবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকসহ অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সভায় কর্মকর্তারা বলেন, পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক এলাকায় সড়কের তুলনায় যানবাহনের চাপ বেশি। এর সঙ্গে ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং, নির্ধারিত স্থান ছাড়া যাত্রী ওঠানামা ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন যুক্ত হয়ে যানজট বাড়াচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা এবং সহযোগিতা প্রয়োজন।