

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মূলত লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) নির্ভর। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় সেই নির্ভরতা কমিয়ে আধুনিক ও ডিজিটাল ট্রেড ফাইন্যান্সের দিকে এগোতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সমন্বিত বৈদেশিক মুদ্রানীতির বিজ্ঞপ্তিতে প্রথমবারের মতো এলসির পাশাপাশি ওপেন অ্যাকাউন্ট ট্রেড, ডকুমেন্টারি কালেকশন, সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স, ফ্যাক্টরিং ও রিসিভেবলস ফাইন্যান্সিং-এর মতো আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত বাণিজ্য অর্থায়ন ব্যবস্থাকে নীতিগত স্বীকৃতি ও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে কাগজভিত্তিক রপ্তানি নথির পরিবর্তে ধাপে ধাপে ডিজিটাল ট্রেড ডকুমেন্ট, ইলেকট্রনিক ট্রান্সফারেবল রেকর্ডস (ETRs) এবং নিরাপদ ইলেকট্রনিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনার পথও উন্মুক্ত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ-১ এর পরিচালক হারুন-অর-রশিদের স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এই বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষকদের মতে শুধু একটি নতুন সার্কুলার নয়; বরং বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল ট্রেড ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি নীতিগত রূপান্তর।
কেন এই পরিবর্তন
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশের অধিকাংশ রপ্তানি এখনও এলসির মাধ্যমে হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে বহু বছর ধরেই বড় ক্রেতারা ওপেন অ্যাকাউন্ট ট্রেড, ডকুমেন্টারি কালেকশন ও সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স ব্যবহার করছে। এসব ব্যবস্থায় কাগজপত্র কম লাগে, লেনদেন দ্রুত হয় এবং অর্থায়নের সুযোগও বাড়ে। নতুন সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, প্রচলিত এলসি ব্যবস্থা বহাল থাকলেও এর পাশাপাশি বিকল্প ট্রেড ফাইন্যান্স ব্যবস্থাগুলো ধীরে ধীরে সম্প্রসারণ করা হবে।
ডিজিটাল বাণিজ্যের ভিত্তি
সার্কুলারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল ট্রেড ডকুমেন্ট ব্যবহারের অনুমোদন। এখন নির্ধারিত শর্তে রপ্তানিকারকরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নথি জমা দিতে পারবেন। ব্যাংকগুলোও নিরাপদ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিদেশি ব্যাংকের কাছে নথি পাঠাতে পারবে। অনুমোদিত ট্রেড করিডরে পরীক্ষামূলকভাবে সম্পূর্ণ ডিজিটাল এলসি ও ডকুমেন্টারি কালেকশন পরিচালনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কুরিয়ারের ওপর নির্ভরতা কমবে, নথি পৌঁছাতে দিনের পরিবর্তে ঘণ্টা লাগতে পারে এবং জালিয়াতির ঝুঁকিও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
রপ্তানিকারকদের কী লাভ
নতুন ব্যবস্থায় বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে আরও নমনীয় শর্তে ব্যবসা করা সহজ হবে।রপ্তানিকারকরা প্রয়োজনে বিদেশে পাওনা অর্থ আগেই ছাড় করিয়ে নিতে পারবেন, যা তাদের কার্যকর মূলধনের চাপ কমাবে। একই সঙ্গে সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স ও ফ্যাক্টরিংয়ের মতো সুবিধা ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্যও নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সুযোগের সঙ্গে কড়া নজরদারি
বাংলাদেশ ব্যাংক সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ওপর দায়িত্বও বাড়িয়েছে। বিদেশি ক্রেতা ও তাদের ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই, অর্থপাচার প্রতিরোধ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি আয় দেশে ফেরানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অনাদায়ী রপ্তানি বিল নিয়মিতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে।
আন্তর্জাতিক মানে এগোনোর বার্তা
এই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তা হলো—বাংলাদেশ কেবল এলসি-নির্ভর বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। ডিজিটাল নথি, বিকল্প ট্রেড ফাইন্যান্স এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে রপ্তানিকে আরও দ্রুত, কম ব্যয়সাপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করার পথেই এগোতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এই পরিবর্তন সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের রপ্তানি খাত বিশ্ব বাণিজ্যের নতুন ধারার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে পারবে।