

দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ব্যাংকটির শনির দশা যেন কাটছেই না। এস আলমের ফেরার গুঞ্জনে ফের অস্থিরতা শুরু হয়েছে ব্যাংকটির গ্রাহকদের মনে। এ আশঙ্কায় কোরবানির ঈদের পর মাত্র ৫ কর্মদিবসেই ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আমানত তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। এছাড়া প্রভাব পড়েছে ব্যাংকটির রেমিট্যান্স আহরণেও। অন্যান্য মাসের তুলনায় চলতি মাসে কম রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সাবেক এমডিকে পুনর্বহাল এবং বর্তমান চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন করছেন ব্যাংকটির গ্রাহকরা। তবে এক্ষেত্রে সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সিদ্ধান্তে অনঢ়। বর্তমান চেয়ারম্যানকেই তারা ব্যাংকটিতে রাখতে চায়। যার কারণে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা আমানত তুলে নেওয়া ও রেমিট্যান্স শাটডাউনের ঘোষণা দেয়। এর প্রেক্ষিতেই আমানত কমছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র মতে, ঈদের আগের সর্বশেষ কার্যদিবস ২৪ মে তারিখে ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা প্রায়। গত বৃহস্পতিবার আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। এরমধ্যেই প্রায় ২৭০০ কোটি টাকার আমানত তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। তবে ব্যাংকটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘আমানত যা তুলে নিয়েছে এর বিপরীতে কিছু আমানত আবার এসেছে। এ কারণে সংখ্যাটা এত খারাপ দেখাচ্ছে না। তবে, শুধু আমানত তোলার হার ভয় জাগানোর মত।’
এদিকে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে রেমিট্যান্স আহরণেও পিছিয়ে পড়ছে ইসলামী ব্যাংক। অন্যান্য মাসগুলোতে রেমিট্যান্স আহরণে অন্যান্য ব্যাংকগুলো অনেকটা পিছিয়ে থাকে ইসলামী ব্যাংকের তুলনায়। কিন্তু এবার দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি জুন মাসের প্রথম ৬ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৭০ কোটি ডলার। এরমধ্যে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ১২ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। যা আগের মাসগুলোর তুলনায় কম। অপরদিকে একই সময়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকও রেমিট্যান্স আহরণ করেছে ১২ কোটি ৭৪ লাখ ডলার। যা ইসলামী ব্যাংকের তুলনায় কিছুটা কম। এছাড়া অগ্রনী ব্যাংকও ১০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পেয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের অনেক প্রবাসী গ্রাহক তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যার প্রমাণ দেখা গেছে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সরকারি ব্যাংকগুলোর হঠাৎ রেমিট্যান্স উত্থানের পেছনে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের অবদান রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসাইনের সঙ্গে। তাকে বেশ কয়েকবার ফোন এবং এসএমএস করলেও তিনি কোনো রিপ্লাই দেননি। এছাড়া ইসলামী ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললেও কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘যে অচলাবস্থা শুরু হয়েছে তার সমাধান যত দ্রুত করা হবে তত মঙ্গল হবে। দেশের অর্থনীতির জন্য ইসলামী ব্যাংকের এ অবস্থা ভালো হবে না।’
এ বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মোস্তাক আহমেদ মুন্সী এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘আমরা আমাদের রক্ত পানি করা পরিশ্রমের অর্থ দেশে পাঠাই। দেশ যেন ভালো থাকে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ যেন ঠিক থাকে। কিন্তু আবার দেখতে পাচ্ছি ব্যাংক ডাকাত এস আলমের হাতে ইসলামী ব্যাংককে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা শুরু করেছে সরকার। এর প্রতিবাদে আমরা বর্তমান চেয়ারম্যান এস আলমের দালাল খুরশীদ আলমকে না সরানো পর্যন্ত রেমিট্যান্স অন্য মাধ্যমে পাঠাবো।’ এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি জুনের প্রথম ৬ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ শতাংশ কম। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ইসলামী ব্যাংকের এই অস্থিরতার কারণে রেমিট্যান্স কম আসছে। আরো কমবে যদি এই অচলাবস্থা সমাধান না করা যায়। তথ্য মতে, চলতি জুনের ৬ তারিখ পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ৬৮ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। অপরদিকে আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ৮৬ কোটি ২৫ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত থেকে কোনো চাপেই সরে আসবে না বাংলাদেশ ব্যাংক। আমানত তুলে নিচ্ছে এ কথা সঠিক নয়। ঈদের পরে অনেকের অনেক প্রয়োজনে টাকা তুলে নিতে হয়। সেই কারণেই তুলে নিচ্ছে। এ টাকা আবার ফেরত আসবে।’
প্রসঙ্গত, বর্তমান চেয়ারম্যানের পদত্যাগ এবং সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল করতে আন্দোলন করছেন ব্যাংকটির গ্রাহকরা। ঈদের ছুটির পরের প্রথম অফিস খোলার দিন আন্দোলন শুরু করেন সচেতন গ্রাহক ফোরাম। সেই আন্দোলনে পুলিশ মারমুখী আচরণ করে।
ইসলামী ব্যাংকের সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানকে ছুটিতে পাঠায় বোর্ড। সেই সিদ্ধান্তটিও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে নেওয়া হয়। এরপর গেল ২৪ মে তারিখে সাবেক চেয়ারম্যান জুবায়দুর রহমান ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। সেদিন সন্ধ্যায় মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিতাড়িত ডেপুটি গভর্নরকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে এস আলমের পক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কাজ করার অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এসব অভিযোগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পরে খুরশীদ আলমকে বিতাড়িত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। সেই তাকেই ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করায় অবাক হয়েছেন সবাই।