শনিবার
২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদিকে হটিয়ে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর শীর্ষে যুক্তরাজ্য

সাইফুল্লাহ আমান
প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ০৭:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

দেশের অর্থনীতি গতিশীল রাখছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স। ২০২৫ সাল থেকে শুরু করে চলতি ২০২৬ সালের জুন মাসেও রেমিট্যান্সের ধারা ঊর্ধ্বমুখী। এরমধ্যেই সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠানোর হিসেবে সৌদিকে হারিয়ে শীর্ষে উঠে এসেছে যুক্তরাজ্য। দেশটি থেকে চলতি বছরের মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৬৪ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। যা টাকার অংকে যার পরিমাণ ১১ হাজার ২৬১ কোটি ২৫ লাখ টাকারও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র মতে, দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের মূল উৎস মধ্যপ্রাচ্য। সেই মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসতো বাংলাদেশে। কিন্তু এবার দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে প্রায় ১০ কোটি ডলার কম। মে মাসে সৌদি প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৫৪ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। শীর্ষ দেশের তালিকায় পিছে চলে গেলেও সামগ্রিকভাবে রেমিট্যান্স প্রাপ্তিতে এগিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্য। যেখানে ইউরোপ ও আমেরিকা অর্থাৎ উন্নত ১৪ টি দেশ থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৩ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের মাত্র ৭ টি দেশ থেকেই প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১৫৪ কোটি ৬৮ লাখ ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছে মোট ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এরমধ্যে ৩০৭ কোটি ডলারের বেশি এসেছে ৩০টি দেশ থেকে। সূত্রমতে, প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে থাকা যুক্তরাজ্য এবং সৌদি আরবের পর সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠানোর তালিকায় তিনে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৪৬ কোটি ৮১ লাখ ডলার। উল্লেখ্য, গেল ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের উপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে অন্যতম ক্ষতিগ্রস্থ দেশ আরব আমিরাত।

গেল মে মাসে দেশে পালিত হয় মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম উৎসব ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। এ ঈদকে সামনে রেখে প্রতিবছরই রেমিট্যান্স বাড়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে আরো বেশি আসতে পারতো রেমিট্যান্স। ইরান যুদ্ধের কারণে যা সম্ভব হয়নি বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই রেমিট্যান্সের হার ঊর্ধ্বমুখী। এরমধ্যেই দেশে একমাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাওয়ার রেকর্ড হয়ে গেছে। এছাড়া প্রতিমাসেই ৩ বিলিয়ন ডলার করে গড়ে রেমিট্যান্স আসছে। এরমাধ্যমেই দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এসেছে। তবে খুব সাম্প্রতিক ইরানের সাথে যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা ব্যহত হয়েছে। যদি এই যুদ্ধাবস্থা না থাকতো তবে মে মাসে রেমিট্যান্স আরো বেশি আসতো।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি ও আরব আমিরাত ছাড়া ওমান থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ২১ কোটি ডলার। কুয়েত ও কাতার থেকে এসেছে যথাক্রমে ১৬ কোটি ৬২ লাখ ও ১২ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। এছাড়া জর্ডান থেকে এসেছে ২ কোটি ৫ লাখ ডলার ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইরাক থেকে এসেছে ৩৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার। সবমিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এ সাতটি দেশ থেকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৪ কোটি ৬৮ লাখ ডলার।

এদিকে পশ্চিমা বিশ্বের বা উন্নত বিশ্বের ১৭ টি দেশ থেকে মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৩ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। এরমধ্যে মালয়েশিয়া থেকে এসেছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩০ কোটি ডলার। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৬ কোটি ১৪ লাখ, ইতালি থেকে ১৬ কোটি ৭২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এর পাশাপাশি ফ্রান্স থেকে এসেছে ৪ কোটি ৮ লাখ ডলার ও অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছে ২ কোটি ৯৪ লাখ ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স।

অপরদিকে কানাডা থেকে ২ কোটি ২৪ লাখ, পর্তুগাল থেকে ১ কোটি ৬২ লাখ, গ্রিস থেকে ১ কোটি ৫৭ লাখ, স্পেন থেকে ১ কোটি ৩৩ লাখ ও জার্মানি থেকে ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে বাংলাদেশে। এছাড়া পোল্যান্ড থেকে ৭০ লাখ, মাল্টা থেকে ৪৪ লাখ ও সাইপ্রাস থেকে ৪২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে বাংলাদেশে।

দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো বাড়াতে সরকারিভাবে বিদেশে শ্রমিক রপ্তানিতে জোর দিতে আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি ড. সায়মা হক বিদিশা। তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে সত্য। তবে এটা আরো বাড়ানোর উপায় আছে। এদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং পাকিস্তান রেমিট্যান্স আয়ে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। যেখানে ভারত থেকে সৌদি আরব যেতে লাগে ৬০ হাজার রুপি সেখানে বাংলাদেশ থেকে যেতে লাগে ৭ লাখ টাকা। এই ব্যবধান কমাতে হবে। তাহলে বিদেশে যাওয়ার হার বাড়বে। এবং এর সাথে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ আরো বিস্তৃত করতে হবে। তাছাড়া উন্নত দেশ যেমন জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজার আমাদের ধরতে হবে।’

বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক জামিল আহমেদ এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘সরকার বোয়েসেলের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত জনশক্তি বিদেশের শ্রমবাজারে রপ্তানি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে করে দেশের শ্রমবাজার উপকৃত হচ্ছে। পাশাপাশি দেশে বেকারত্বের হার কমছে। এখন পর্যন্ত সারাবিশ্বে আমাদের প্রায় সোয়া এক কোটি প্রবাসী অবস্থান করছেন। তারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। অচিরেই আরো প্রচুর শ্রমিক আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপে পাঠাতে পারবো। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলছে। সেখানেও আমাদের শ্রমিকদের রপ্তানি করার প্রস্তুতি চলছে।’

খরচ কমানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খরচ কমানোর ব্যাপারটি শুধু একটি পক্ষের উপরে নির্ভর করে না। এখানে দালালের দৌড়াত্ম, শ্রমিকের জানার ঘাটতিও জড়িত। তবে হ্যাঁ, সরকারের পক্ষ থেকে আমরা চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব প্রক্রিয়া সহজ করার।’

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএমইটির একজন পরিচালক এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘শ্রমিক রপ্তানিতে প্রথমেই দেশের পরিবেশ পরিবর্তন করতে হবে। একজন নাগরিক প্রবাসে যেতে সবগুলো ধাপেই প্রতিবন্ধকতা ফেস করেন। পাসপোর্ট করা থেকে শুরু করে বিমানে ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তাকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিএমইটিতেও প্রবাসে যেতে ইচ্ছুকদের হয়রানি করা হয়। এর মূলে রয়েছে দালালদের দৌড়াত্ম। এগুলো সহজ করতে পারলে বিদেশে যাওয়ার হার আরো বাড়বে।’

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Netherlands VS Sweden
Scheduled
20 Jun, 11:00 PM
VS
World Cup