

বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াতে লজিস্টিকস খরচ কমাতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী নেতারা। লজিস্টিকস খরচ ২৫ শতাংশ কমাতে পারলে রপ্তানি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মন্তব্য করেন ব্যবসায়ী নেতারা। অন্যদিকে পণ্য পরিবহন খরচ ১ শতাংশ কমলে রপ্তানি ৭.৪ শতাংশ বাড়তে পারে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
শনিবার (৯ এপ্রিল) ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত 'ডেভেলপিং অ্যান ইন্টিগ্রেটেড পোর্ট অ্যান্ড লজিস্টিকস সেক্টর ফর ট্রেড-ডিপেনডেন্ট বাংলাদেশ' শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী নেতারা বলেছেন, বাংলাদেশের দুর্বল লজিস্টিক অবকাঠামো এবং উচ্চ ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বন্দর, পরিবহন এবং সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত সংস্কার ছাড়া রপ্তানি প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকবে।
অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই-এর সিনিয়র সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী বলেন, 'লজিস্টিকস খাতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব দেশের রপ্তানি সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে, যার ফলে বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে।'
তিনি বলেন, 'বন্দরে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, সড়ক ও রেলপথে ধীরগতির পরিবহন ব্যবস্থা এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস সুবিধার স্বল্পতা সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যয়বহুল ও অদক্ষ করে তুলেছে।'
বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নে তিনি বন্দরে কাগজবিহীন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) ভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন লজিস্টিকসে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান প্রায় ৪০ শতাংশ, যা অনেক প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বেশি। তবে আরও প্রসারের জন্য দেশি ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
তিনি উল্লেখ করেন যে, গত চার দশকে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসলেও রপ্তানি আয় এখনও সীমিত সংখ্যক পণ্য ও বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তাই টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পণ্য বহুমুখীকরণ অপরিহার্য। মাসরুর রিয়াজ বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নীতি সংস্কারের ওপরও জোর দেন। তিনি দুর্বল লজিস্টিকস কাঠামো এবং উচ্চ পরিচালনা ব্যয়কে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরির পথে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি আরও বলেন, 'লজিস্টিকস খাতের উন্নয়নে জাতীয় লজিস্টিকস নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানের বিদেশি অপারেটর এবং দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কনটেইনার খালাসের সময় কমানো এবং নীতিগত বাধাগুলো দূর করা অপরিহার্য।'
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) মহাপরিচালক মো. সেলিম উল্লাহ বলেন, 'সমন্বিত বন্দর ও লজিস্টিকস সেবার দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশ উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে, যা ক্রমাগত ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।' তিনি এই খাতের আধুনিকায়নে সকল স্টেকহোল্ডারদের সমন্বিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।
অতিরিক্ত সচিব এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, 'ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আর বাড়ানোর সুযোগ সীমিত, তাই দ্রুত এবং সাশ্রয়ী পণ্য পরিবহনের জন্য রেল সংযোগই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
তিনি দেশের অন্তত একটি সমুদ্রবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতকে দেওয়ার প্রস্তাব করেন। তার মতে, এর ফলে তৈরি হওয়া প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেবার মান বাড়বে এবং বিদ্যমান শুল্ক হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, 'অবাস্তব উন্নয়ন পরিকল্পনার কারণে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পারেনি, বিশেষ করে পরিবহন অবকাঠামোতে।'
তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব নিশ্চিত করতে যোগাযোগ অবকাঠামোকে অবশ্যই সমন্বিত এবং সুসংগত হতে হবে।
শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসকে মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, 'পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালে স্ক্যানার মেশিনের অনুপস্থিতি ব্যবসায়ীদের এই বন্দর ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করছে।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অভ্যন্তরীণ নৌপথের অপর্যাপ্ত অবকাঠামো শিল্প কারখানার পরিবহন খরচ কমানোর পরিবর্তে উল্টো বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিস্ট নুসরাত নাহিদ বাবি বলেন, 'বাংলাদেশে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া এখনও পর্যাপ্তভাবে সহজ এবং আধুনিক করা হয়নি, বিশেষ করে স্থলবন্দরগুলোতে ডিজিটাল সিস্টেমের অনুপস্থিতি রয়েছে। ফলে পণ্য খালাসে বিলম্ব ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।'
এডিবি-র সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হুমায়ুন কবির জানান, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ধীরাশ্রম আইসিডি কনটেইনার ডিপো এবং একটি মাল্টিমোডাল লজিস্টিকস হাব প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে। তিনি লজিস্টিকস সেবার প্রতিটি পর্যায়ে ডিজিটাল ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন।
অন্যদের মধ্যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান এবং লজিস্টিকস ও ব্যবসা খাতের প্রতিনিধিরা এই আলোচনায় অংশ নেন।