

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


টাঙ্গাইল পৌর এলাকায় কিশোর ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে মাদকাসক্তির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, ইয়াবা ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকের প্রতি তরুণদের ঝোঁক বাড়ছে। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান চললেও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি তাদের। এর প্রভাব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি সামাজিক পরিবেশেও পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌর শহরের ক্যাপসুল মার্কেট, কেন্দ্রীয় ঈদগাহ, বেড়াডোমা ব্রিজ পার, টাঙ্গাইল আউটার স্টেডিয়াম, হাউজিং মাঠ, সবুর খান টাওয়ারের সামনের রাস্তা, ছয়আনি পুকুর পার, টাঙ্গাইল সরকারি বিন্দুবাসিনী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনের বড় পুকুর পার, শহিদ স্মৃতি পৌর উদ্যানের পেছনের নজরুল সেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তাসহ পুরো গলি, পরিত্যক্ত ভাসানী হল চত্বর, কান্দাপাড়া, বাজিতপুর টেক্সটাইল মোড়, রাবনা বাইপাস , সৌখিন মৎস্য শিকারি সমিতির পাশে লেকের পার, শহরে প্রাণকেন্দ্র শহীদ মিনারসহ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশে এরা দলবেঁধে সন্ধ্যার পর মিলিত হয় মাদক সেবনে। এই সব আড্ডায় একই সাথে চলে মোবাইল জুয়া। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, মাদকসেবীদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে। কোথায় আড্ডা হবে, কোথা থেকে মাদক সংগ্রহ করা যাবে কিংবা কোথাও অভিযান চলছে কি না—এসব তথ্য ওই গ্রুপের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া শহরে মাদক সহজে না মিললে অনেকেই মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে আশপাশের ইউনিয়ন ও শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মাদক সংগ্রহ করেন বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদক বিক্রেতা জানান, এখন আর মাদক বিক্রির কোন নির্দিষ্ট স্পট নেই। মোবাইল ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় চাহিদা অনুযায়ী মাদক পৌঁছে দেওয়া হয়। ইয়াং জেনারেশনের কাছে এখন সবচেয়ে বেশি চাহিদা ইয়াবা ও গাঁজার। অর্ডার পেলে পৌর এলাকার যে কোন স্থানে তিনি ৩০ মিনিটের মধ্যে অর্ডারকৃত মাদকদ্রব্য পৌঁছে দেন। তবে দূরত্ব অনুযায়ী চার্জ ধরা হয়। শহরের একটি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানায়, শহরের আদালত পাড়ার এক বন্ধুর সাথে থেকে সে ইয়াবা খাওয়া শিখেছে। ইয়াবা না পেলে গাঁজা চলে। তবে মাদক ছাড়া তার একদমই ভালো লাগে না। এমনকি পরীক্ষার হলেও পরীক্ষা দেওয়ার পূর্বে মাদক সেবন করে যেতে হয়, না হলে তার মাথা কাজ করে না।
সে আরও জানান, বেশ কিছু দিন হলো প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে মাদক সেবনের সমস্যা হচ্ছে ও দামও বেড়েছে, তাই চেষ্টায় আছে কিভাবে মাদক সেবন থেকে বিরত থাকা যায়।
টাঙ্গাইল আউটার স্টেডিয়ামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন দোকানদার জানান, প্রতিদিনই ঈদগাহে বসে জমজমাট মাদকের আড্ডা। শহরের বিভিন্ন এলাকার কিশোর-যুবকেরা এসে জড়ো হয় এই মাঠে, মাঝ রাত পর্যন্ত চলে মাদক সেবন, একই সাথে চলে মোবাইল জুয়া। মাঝে মাঝে প্রশাসন অভিযান চালালে কিছু দিন বন্ধ থাকে, তারপর আবার আগের মত চলে মাদক ও জুয়া।
এ প্রসঙ্গে সরকারি সৈয়দ মহব্বত আলী ডিগ্রী কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, সরকার ইদানিং মাদক ব্যবসায়ী সহ মাদক সেবীদের আটকে বেশ তৎপর। তারপরও থেমে নেই মাদক সেবন। শুধুমাত্র প্রশাসনিক তৎপরতা মাদকের ভয়াবহতা বন্ধ করতে পারবে না, এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সচেতনতা।
টাঙ্গাইল সচেতন নাগরিক ফোরামের সভাপতি আকিবুর রহমান ইকবাল বলেন, বিগত দিনে স্কুল- কলেজের শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিশোর গ্যাং ও কিশোরদের মধ্যে মাদকাসক্তি তৈরি হয়েছিল। সেই কালচার থেকে বের হয়ে আসতে কিছুটা সময় লাগবে। বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। আশা করছি, খুব শীঘ্রই অবস্থার উন্নতি হবে। এ ছাড়াও মাদকের বিরুদ্ধে পারিবারিক ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে টাঙ্গাইল জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আহসান কবীর বুলবুলের সরকারি মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
মাদকাসক্তি ও কিশোরদের মোবাইল গেমে আসক্তির কারণে টাঙ্গাইল পৌর শহরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। তারা দ্রুত প্রশাসনিক অভিযান ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই পরিস্থিতি উন্নতির দাবি জানিয়েছেন।