বৃহস্পতিবার
২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঘোড়ার নেশায় জীবন গড়েছেন সখীপুরের আবুল হাসেম

সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
সখীপুরের আবুল হাসেম
expand
সখীপুরের আবুল হাসেম

প্রচলিত প্রবাদ— “লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে”। তবে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বহুরিয়া গ্রামের আবুল হাসেম (৬৮) যেন নিজের জীবন দিয়ে সেই কথার উল্টো প্রমাণ করেছেন। পড়াশোনায় খুব বেশি এগোতে না পারলেও আজ তিনি গাড়ি-ঘোড়ার মালিক, সফল ব্যবসায়ী এবং দেশজুড়ে পরিচিত এক ঘোড়াপ্রেমী মানুষ।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, স্বাধীনতার আগে আবুল হাসেমের বাবা মৃত বছির উদ্দিন ছিলেন তৎকালীন যাদবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। ছোটবেলা থেকেই বাবার হাতি ও ঘোড়ার সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠেন তিনি। বিশালদেহী হাতির চেয়ে ঘোড়ার প্রতিই ছিল তার বেশি আকর্ষণ। মাত্র সাত বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর পরিবারের সদস্যরা হাতি-ঘোড়া বিক্রি করে দিলেও ঘোড়ার প্রতি তার ভালোবাসা কমেনি।

পরে মায়ের কাছে আবদার করলে তিনি একটি ঘোড়া কিনে দেন। সেই শুরু, এরপর থেকে ঘোড়াই হয়ে ওঠে তার জীবনের সঙ্গী।

ঘোড়ার প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে লেখাপড়ায় খুব বেশি এগোতে পারেননি আবুল হাসেম। তবে জীবন থেমে থাকেনি। স্বাধীনতার পর একটি বাস দিয়ে শুরু করেন পরিবহন ব্যবসা। ধীরে ধীরে সেই ব্যবসা বিস্তৃত হয়ে একসময় ১৩টি বাসের মালিক হন তিনি। পরে দেশে সিএনজি ও অন্যান্য যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে গেলে বাস ব্যবসা কমিয়ে পুরোপুরি মনোযোগ দেন ঘোড়ার খামারে।

বর্তমানে তার খামারে রয়েছে মারোয়ারি, থ্রপিট, সিন্ধি ও দেশিসহ বিভিন্ন জাতের ১৪-১৫ টি ঘোড়া। জাতভেদে এসব ঘোড়ার দাম ২ লাখ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত। ভারত থেকে ঘোড়া এনে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিক্রিও করেন তিনি। শুধু সাধারণ ক্রেতাই নয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত ঘোড়া সরবরাহ করেছেন আবুল হাসেম।

শুধু খামার নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতাতেও নিয়মিত অংশ নেয় তার ঘোড়া। সাতক্ষীরা, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, সিলেট ও সুনামগঞ্জসহ দেশের নানা প্রান্তে তার ঘোড়া অসংখ্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ফ্রিজ, মোটরসাইকেল, টেলিভিশন, গরু, খাসিসহ বিভিন্ন পুরস্কার জিতেছে। তার ঘোড়ায় চড়ে জনপ্রিয় নারী সওয়ারী তাসলিমা, হালিমা, দিঘী ও সোনিয়াসহ অনেকেই জয় পেয়েছেন বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়।

এদিকে, আবুল হাসেমের খামারে প্রায় পাঁচ বছর ধরে সওয়ারী হিসেবে কাজ করছেন একই গ্রামের সোহেল মিয়া (১৫)। ছোটবেলা থেকেই ঘোড়ার প্রতি আগ্রহ থাকায় তিনি খামারে এসে ঘোড়া চালানো শেখেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘোড়দৌড়ে অংশ নিয়ে পুরস্কারও জিতছেন তিনি। ঘোড়ার নেশায় লেখাপড়াও ছেড়ে দিয়েছেন সোহেল। তার স্বপ্ন একদিন দেশসেরা সওয়ারী হওয়া।

সোহেলের দেখাদেখি তার চাচাতো ভাই ফারুকও (৯) ঘোড়ার রেসে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সেও এখন নিয়মিত খামারে আসে এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার জিতেছে। ভবিষ্যতে এই পেশাতেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় ছোট্ট ফারুক।

আবুল হাসেমের বড় ছেলে রাহাত বলেন, “একসময় মনে হতো বাবা আমাদের চেয়ে ঘোড়াগুলোকে বেশি সময় দেন। পরে বুঝেছি, এই ঘোড়াগুলোর মাঝেই তিনি আনন্দ খুঁজে পান। বাবা যেন এভাবেই সুখে বেঁচে থাকেন।”

আধুনিক যুগেও বিয়ের অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজনে ঘোড়া নিয়ে হাজির হন আবুল হাসেম। তার ভাষায়, “আমার পাজেরো গাড়ি আছে। কিন্তু সেই গাড়ি নিয়ে কোথাও গেলে যতটা শান্তি পাই, তার চেয়ে বেশি শান্তি আর সম্মান পাই ঘোড়া নিয়ে গেলে।”

সখীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, “আবুল হাসেমের মতো উদ্যোক্তারা গ্রামীণ পর্যায়ে ব্যতিক্রমী খামার গড়ে তুলে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করছেন। সঠিক পরিচর্যা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগ কর্মসংস্থান ও বিনোদন খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ঘোড়া লালন-পালন করে যেতে চান ব্যতিক্রমী এই মানুষটি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন