শুক্রবার
১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুলতানের কাঁধেই চরের ভবিষ্যৎ

শামীম শাহরীয়ার রাফি, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
মায়ের পাশে হেঁটে চলেছে ছোট্ট একটি বাচ্চা ঘোড়া নাম সুলতান
expand
মায়ের পাশে হেঁটে চলেছে ছোট্ট একটি বাচ্চা ঘোড়া নাম সুলতান

সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়া চর। ধূ ধূ বালুচর, দিগন্তজোড়া নিঃসঙ্গতা। চোখ যতদূর যায় শুধু বালি আর শূন্যতা। উত্তাল যমুনার বুকে জেগে ওঠা এসব চরে নেই পাকা রাস্তা, নেই যান্ত্রিক যানবাহনের চলাচল। তবুও জীবন থেমে নেই। খটখট শব্দ তুলে ছুটে চলে ঘোড়ার গাড়ি, আর সেই সাথেই ঘুরতে থাকে চরের মানুষের জীবনচাকা।

শুধু নাটুয়ারপাড়া চরই নয়, সিরাজগঞ্জের কাওয়াখোলা চরসহ আরও বেশ কয়েকটি চরের চিত্র প্রায় একই। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব, আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সংকট, সব মিলিয়ে এসব অঞ্চলের মানুষের জীবনে ঘোড়ার গাড়িই প্রধান ভরসা।

এ অঞ্চলে ঘোড়ার গাড়ি কোনো বিলাস নয় বরং বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। হাটে ফসল নেওয়া, অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছানো কিংবা শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাওয়া। সবকিছুর জন্যই নির্ভর করতে হয় এই ঘোড়া আর তার গাড়ির ওপর। প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধের নীরব সঙ্গী তারা।

এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেই চোখে পড়ে এক কোমল দৃশ্য। মায়ের পাশে পাশে হেঁটে চলেছে ছোট্ট একটি বাচ্চা ঘোড়া নাম তার সুলতান। এখনো তার চোখে কৌতূহল, চলায় সরলতা। মাঝে মাঝে বালুর ওপর দৌড়ে আবার ফিরে আসে মায়ের কাছে। তার এই নির্ভাবনা ছুটে চলা যেন চরের কঠিন জীবনের ভেতর এক টুকরো কোমল অনুভূতি।

কিন্তু এই কোমল সময় বেশিদিন থাকবে না। আর মাত্র দেড় বছরের মধ্যেই সুলতানকে নামতে হবে জীবনের কঠিন বাস্তবতায়। মায়ের মতোই টানতে হবে গাড়ি, বইতে হবে মানুষের বোঝা, আর বয়ে নিতে হবে জীবনের দায়।

বাচ্চা ঘোড়া সুলতানের মালিক আলি আজগর বলেন, এই বাচ্চাটাকে আমি সন্তানের মতোই বড় করছি। এখনো ওর কোনো চিন্তা নেই, শুধু খেলে আর দৌড়ায়। কিন্তু এই চরে বড় হলে তো কাজ করতেই হবে। ওকেও একদিন গাড়ি টানতে হবে।

আরেক ঘোড়ার মালিক আব্দুল ওহাব জানান, আমাদের সবকিছুই এই ঘোড়ার ওপর নির্ভর করে। রোদে-বৃষ্টিতে ওদের নিয়েই চলতে হয়। কিন্তু চিকিৎসা বা খাবারের ঠিকঠাক ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় বিপদে পড়ি।

চরের অর্থনীতি অনেকটাই কৃষিনির্ভর। বাদাম, মরিচ, ভুট্টা আর ধানই এখানে প্রধান ফসল। একসময় এসব ফসল মাথায় করে মাইলের পর মাইল হেঁটে বাজারে নিতে হতো। এখন ঘোড়ার গাড়ি কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে, তবে সংগ্রাম এখনো আগের মতোই কঠিন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। কিন্তু রাস্তা ভালো না থাকায় সময় বেশি লাগে, খরচও বাড়ে। তারপরও এইভাবেই চলতে হচ্ছে।

তবে এই সামান্য স্বস্তির আড়ালেও রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। তপ্ত বালুর ওপর দিনের পর দিন পরিশ্রম করে ঘোড়াগুলো। অসুস্থ হয়ে পড়লে নেই দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা। তখন চরম বিপাকে পড়েন মালিকরা।

এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হক বলেন, চরের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

চরের মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়, একটি টেকসই রাস্তা, কিছু আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, আর প্রাণীদের জন্য ন্যূনতম চিকিৎসা ব্যবস্থা। তবুও তারা আশাবাদী। ধূ ধূ বালুচরের বুক চিরে যেমন প্রতিদিন ঘোড়ার গাড়ির চাকা ঘোরে, তেমনি একদিন বদল আসবে এই জীবনেও,এই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়ে চলছে মানুষ। আর সেই পথেই বড় হচ্ছে ছোট্ট সুলতান, যে একদিন শুধু একটি ঘোড়া নয়, হয়ে উঠবে চরের মানুষের টিকে থাকার আরেক নীরব সহযোদ্ধা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন