শনিবার
০১ আগস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
০১ আগস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শরীয়তপুরে জরাজীর্ণ হাসপাতালে চলছে চিকিৎসাসেবা, বড় দুর্ঘটনার শঙ্কা

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০১:২৪ পিএম
expand
শরীয়তপুরে জরাজীর্ণ হাসপাতালে চলছে চিকিৎসাসেবা, বড় দুর্ঘটনার শঙ্কা

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনের ছাদে ফাটল দেখা দিয়েছে। খসে পড়ছে একাধিক যায়গায় ছাদের পলেস্তারা ও সুরকি। ডাক্তার, রোগী ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার না হলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ১৯৭২ সালের দিকে ভেদরগঞ্জ উপজেলার সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য ৩১ শয্যায্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল হিসেবে নির্মিত হয়। এরপর ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন ভবন তৈরি করে ১৯ শয্যা একটি তিনতলা আধুনিক ভবন নির্মাণ করে হাসপাতালটি ৫০শয্যায় উন্নীত করা হয়। কাগজে-কলমে ৫০শয্যা হাসপাতাল হলেও বাস্তবে ৩১শয্যার লোকবল দিয়ে চলছে স্বাস্থ্যসেবা।

জানা গেছে, দুইটি থানা ভেদরগঞ্জ ও সখিপুর নিয়ে গঠিত এই উপজেলায় প্রায় ৩ লাখ ৩ হাজার ৫৩৫ জন জনসংখ্যার বসবাস। বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ মানুষ আসে চিকিৎসা সেবা নিতে। বর্তমানে ৫০ শয্যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি বিভিন্ন সংকটে ভুগছে। হাসপাতালে চিকিৎসক থাকার কথা ৪৫ জন কিন্তু বর্তমানে আছে ২০ জন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা ১৭৩ কিন্তু আছে ১১৩ জন। রয়েছে নার্স সংকট, নেই এনেস্থিসিয়া ডাক্তার, হচ্ছে না কোনো সিজারিয়ান অপারেশন। হাসপাতালে নেই অ্যাম্বুলেন্স। নেই এক্স-রে মেশিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। আর পুরাতন ভবনেই চলছে চিকিৎসাসেবা।

রবিবার ২৬ জুলাই হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, শত শত রোগী আসে চিকিৎসা সেবা নিতে। কেউ সিটে আবার সিট সংকটে কেউ কেউ আছে ফ্লোরে। হাসপাতাল ভবনের প্রথম তলা, দ্বিতীয় তলায় ছাদের বিভিন্ন স্থানে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ওই স্থানগুলো থেকে পলেস্তারা ও সুরকি ভেঙে পড়ছে। অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগের রোগীরা ওই স্থানগুলো এড়িয়ে চলছেন। আর যখন বাধ্য হয়ে ওই স্থান ব্যবহার করছেন, তখন তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। শুধু রোগীরই নন, এমন আতঙ্ক দেখা গেছে হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারী ও রোগীর স্বজনদের মধ্যেও। গত ২২ জুলাই দুপুরে হটাৎ করে পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তার অফিস কক্ষের ছাদের বড় একটি অংশ ধসে পড়ে। সেখানে কর্তব্যরত একজন নার্স অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায়। শুধু সেখানেই না পূরো ভবন জুড়ে একাধিক যায়গায় পলেস্তারা খসে পড়েছে। ফাটল দেখে দিয়েছে জরুরি বিভাগ, ডাক্তারের বিশ্রামাগার, রুগীদের থাকার ওয়ার্ডে গুলোতে। দ্রুত সময়ের মধ্যে পুরাতন ভবনটি একটি নতুন ভবন করা না হলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

সখিপুর ইউনিয়নের বেপারি কান্দি এলাকার বাসিন্দা রুনা বেগম(৪০)। ৫ বছরের মেয়েকে নিয়ে চারদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছেন তিনি। রবিবার সকালে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছি চারদিন ধরে। হাসপাতালের দ্বিতীয় তলা থেকে নেমে মেয়ের ওষুধ আনার জন্য বাইরে যাচ্ছিলাম। হাঁটছি আর আতঙ্ক নিয়ে বারবার ছাদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামার পরই ছাদের ফাটলের স্থান। মাঝেমধ্যেই সিমেন্ট–সুরকির বড় বড় অংশ পড়ছে। এ স্থান দিয়ে যাওয়ার সময় ভয় লাগে। এভাবে একটি হাসপাতালে থাকা যায় না। ভয়ে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যাবে।

রামভদ্রপুর ইউনিয়নের ভাটিতা গ্রামের বাসিন্দা শিপন মিয়া (৪৫)। দুদিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিনি। রবিবার সকাল ১০টার দিকে কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, হাসপাতালে মানুষ আসে সুস্থ হওয়ার জন্য। কিন্তু এ হাসপাতালে এসে থাকি আতঙ্কে। কোনো সময় যেন মাথায় ভেঙে পড়ে ছাদ। হাসপাতালের অনেক জায়গায় ভেঙে ভেঙে পড়েছে। আবার হাসপাতালে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য নাই কোনো মেশিন। পর্যাপ্ত মেশিন ও ভবন সংস্কার করার জন্য সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানাচ্ছি।

সোলায়মান প্রধানীয়া নামে এক রোগীর অভিভাবক জানান, এক ঘণ্টা ধরে তারা চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু ডাক্তার ও রোগীদের নজর একটু পরপরই ছাদের দিকে। কারণ কখন ছাদের পলেস্তারা খসে তাদের ওপর পড়ে। যতক্ষণ হাসপাতালে ছিলাম ততক্ষণ খুব আতঙ্কে ছিলাম। আমি শরীয়তপুর- ৩ আসনের সংসদ সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু ও সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসার জন্য একটি ভবন নির্মাণ করা জরুরী।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. জহিরুল ইসলাম বলেন, হাসপাতাল ভবনের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রথম তলা ও দ্বিতীয় তলার ছাদে ফাটল আছে। খসে খসে পড়ছে পলেস্তারা, ইটের সুরকি ও সিমেন্ট বালুর মিশ্রণ বিভিন্ন অংশে দেখা যাচ্ছে রড। জনসাধারণকে সতর্ক করার জন্য আমরা আনসার সদস্যদের দিয়ে সতর্ক করাচ্ছি। আমরা চিকিৎসকরা সঠিকভাবে নিয়মিত চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। তবে ভয়ে আমাদের কিছুটা চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু নাঈম মো. ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের পলেস্তারা ভেঙে খসে পড়ছে। বিষয়টি রোগী এবং ডাক্তারের মধ্যে আতংক সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। এছাড়াও হাসপাতালে মেশিন সরঞ্জাম ও চিকিৎসক, নার্সসহ জনবল সংকট রয়েছে। আমরা সর্বোচ্চটা দিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের নার্স সংকট, নেই এনেস্থিসিয়া ডাক্তার, তাই আপাতত সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ রয়েছে। এছাড়াও ড্রাইভার না থাকায় অ্যাম্বুলেন্স সেবাও বন্ধ।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন