শুক্রবার
১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

‘মাল যা লাগে আমরা দেবো’ বিএনপি নেতার হুমকি

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম
ইনসেটে স্থানীয় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম ফরাজী।
expand
ইনসেটে স্থানীয় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম ফরাজী।

এখানে যত কাজ হয় আমরা বিএনপি'র নেতারা কাজ করব, যা মাল লাগে আমরা দেবো, বাইরের কোন লোক এখানে কাজ করতে পারব না। এভাবেই শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পৈল্যান মোল্লার কান্দি এলাকার পদ্মা নদীভাঙন রোধে ব্লক তৈরীর সাইটের লোকজনকে হুমকি ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের একজন প্রকৌশলীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্বনাওডোবা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও তার নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে।

বুধবার (৮ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মারধোর ও হুমকি দেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হলে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়।

স্থানীয় ও ব্লক সাইটে কর্মরতরা জানান, গত ৬ এপ্রিল দুপুরে পূর্বনাওডোবার পৈল্যান মোল্লার কান্দি এলাকায় ব্লক তৈরীর সাইটে হঠাৎ বেশ কয়েকজন লোকজন নিয়ে প্রবেশ করেন স্থানীয় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম ফরাজী। প্রথমে তারা এফআইডিএল-ভিনসেন জেবি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের আওতায় কাজ করা বেঙ্গল কন্স্ট্রাকশনের সাইটে গিয়ে সেখানে ব্লক তৈরীতে নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রমাণ পায়। পরে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের কাজ বন্ধ করতে বাধ্য করেন। এরপর পাশেই অবস্থিত খুলনা শিপইয়ার্ড কোম্পানির ব্লক তৈরীর সাইটে প্রবেশ করেন ওই বিএনপি নেতা'রা। পরে সেখানে ব্লক তৈরীতে ব্যবহৃত সরঞ্জামে কোন সমস্যা না পেলেও সেখানে কর্মরত শ্রমিক ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও ইঞ্জিনিয়ারকে মারধোর করেন এবং সেখানে কাজ চালাতে হলে শুধু তাদের (বিএনপি নেতাদের) নিয়ে কাজ করতে হবে বলে হুমকি প্রদান করেন। হুমকি প্রদানের সময়ের ২ মিনিট ২১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সেখানে বিএনপি নেতাদের বলতে শোনা যায়, ‘‘এখানে যত কাজ হয় আমরা বিএনপি'র নেতারা কাজ করব, যা মাল লাগে আমরা দেবো, বাইরের কোন লোক এখানে কাজ করতে পারব না। আর বাইরের লোক নিয়া যে কাজ করবো সে এখানে কাজ করতে পারবে না।’’

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, পদ্মা সেতু প্রকল্প রক্ষাবাঁধ জাজিরা প্রান্তের পুর্বনাওডোবা এলাকায় ধসে পড়ায় সেখানে পুনরায় বাঁধের জন্য ৩৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০২৩ সালের অক্টোবরে। প্রকল্পটি সম্পন্ন করার মেয়াদ বেঁধে দেয়া হয়েছে ২০২৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত। সেখানে ৩১টি প্যাকেজে কাজ করছে মোট ১১টি কোম্পানি। যারমধ্যে রয়েছে- খুলনা শিপইয়ার্ড, এফআইডিএল-ভিনসেন জেবি, টেকবে লিটন মল্লিক জেবি, জামিল ইকবাল, এসএস ইঞ্জিনিয়ারিং, গোলাম রব্বানি, আমিন ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স, রহমান ইঞ্জিনিয়ারিং-জুয়েল কন্স্ট্রাকশন জেবি, এমএম বিল্ডার্স, নবারন ট্রেডার্স। এছাড়াও ৩১টি প্যাকেজের মধ্যে ২টি প্যাকেজের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকী ২৯টি প্যাকেজের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পাউবো কর্তৃপক্ষ।

গত ৬ এপ্রিল ঘটনার বিষয়ে খুলনা শিপইয়ার্ডের পক্ষে ব্লক তৈরীর সাইটে কাজ করা ত্রিপল এ এন্টারপ্রাইজ কোম্পানির প্রধান প্রকৌশলী এসএম আখতারুজ্জামান বলেন, ‘তিনি সাধারণত তাদের ঢাকার কার্যালয়ে বসেন। ঘটনার বিষয়ে শুনে তদন্ত করতে এখানে এসেছেন। তার স্টাফদের কাছে জানতে পারেন তাদের ব্লক তৈরীতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহকারী সাব ঠিকাদার স্থানীয় নিয়ামত মাদবরের সাথে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তাদের একজন স্টাফ ভিডিও করায় তার সাথে ধাক্কাধাক্কির একটি ঘটনা ঘটেছে।’

এ বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও ব্লক তৈরীতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহকারী সাব ঠিকাদার স্থানীয় নিয়ামত মাদবর বলেন, ‘আমরা কাজ করছিলাম এসময় হঠাৎ ১০-১৫ জন লোক অফিসে আসেন। এরমধ্যে ছিলেন পূর্বনাওডোবা ইউনিয়ন বিএনপি'র সভাপতি রফিক ফরাজি, যুবদল নেতা মোহসিন মাদবর, শ্রমিক দল নেতা জলিল শেখ ও যুবদল নেতা সলেমান সরদার। তারা এসেই অফিসের ইঞ্জিনিয়ারসহ অন্যান্যদের ব্লক বানানোর সরঞ্জাম নিম্নমানের ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অপবাদ দিয়ে ধমকানো শুরু করে। পরে তারা বলেন, এই সাইটে যত কাজ হবে সব বিএনপি'র লোক ছাড়া বাইরের আর কোন লোক কাজ করতে পারবে না। আর যদি কেউ বাইরের লোক দিয়ে কাজ করায় তাহলে সে এখানে কাজ করতে পারবে না। ওই সময় ইঞ্জিনিয়ার রাতুল ভিডিও করায় তাকে তারা মারধর করেন।’

মারধরের শিকার ত্রিপল এ কোম্পানির সিভিল প্রকৌশলী মেহেদী হাসান রাতুল বলেন, ‘‘আমরা অফিসে ছিলাম, সেখানে কাজ করার সময় হঠাৎ বেশ কয়েকজন লোক আসেন। তাদের আমি তেমনভাবে চিনিনা। তবে তারা বিএনপির রাজনীতি করে বলে জানিয়েছেন। তারা এসেই মালামাল খারাপ অপবাদ দিতে থাকে। তখন আমি তাদের বলি -আপনাদের কাছে যদি মনে হয় কোন মালামাল খারাপ তাহলে সে বিষয়ে আমাদের উর্ধ্বতনদের জানান। তখন এক পর্যায়ে তারা বলেন, আমাদের ছাড়া এখানে কেউ ব্যবসা করতে পারবে না। ওইসময় আমি ভিডিও করছিলাম। তারা তা দেখার পর আমাকে মারধর শুরু করেন, আমার শার্ট ছিঁড়ে ফেলে ও আমাকে অনেক মারধর করে। সেসময় আমি যখন প্রতিবাদ করি তখন তারা নিজেরাই ফেসবুক লাইভে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে উল্টাপাল্টা কথা বলা শুরু করে এবং আমাদের কাজের শেষে ফেলে দেওয়া রাবিশ নিয়ে এসে অপবাদ দিতে থাকে আমরা নাকি এগুলো দিয়ে ব্লক বানাই। ঘটনার বিষয়ে আমার উপরস্থ কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। তারা আইনানুগ ব্যবস্থা নিবে।

অপরদিকে পাশেই এফআইডিএল-ভিনসেন জেবি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের আওতায় কাজ করা বেঙ্গল কন্স্ট্রাকশনের সাইট প্রকৌশলী শাকিল হাসান সোহাগ বলেন, ‘আমাদের কাজ চলমান থাকা অবস্থায় স্থানীয় বিএনপি নেতা রফিক ফরাজি লোকজন নিয়ে এসে আমাদের কাজ বন্ধ করে দেন। কারন হিসেবে বলেছেন আমাদের মেটেরিয়ালস খারাপ। এরপর থেকে আমাদের কাজ বন্ধ আছে।’

তবে ওই সাইটে যেসকল সরঞ্জাম দিয়ে ব্লক তৈরী করা হচ্ছিল তার মধ্যে বালু ও পাথর নিম্নমানের ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মজিবুর রহমান মাদবর বলেন, ‘আমাকে হঠাৎ বেঙ্গল কন্স্ট্রাকশনের হেড অফিস থেকে ফোন করে জানানো হয়, সাইটের কাজ নাকি করা বন্ধ করে দিয়েছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি বিএনপি নেতা রফিক ফরাজি, মহসিন মাদবরসহ ১০-১২ জন এসে কাজ বন্ধ করে দিয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে তাদের কাছে আমি জানতে চাইলে তারা আমাকে জানায় নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করা হচ্ছে তাই কাজ বন্ধ করেছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম ফরাজী বলেন, ‘‘ব্লক সাইটে নিম্নমানের পাথর ও বালু দিয়ে কাজ করছিল। তাই আমরা গিয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছি।’’ এছাড়াও প্রকৌশলীকে মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন একটু তর্কাতর্কি হয়েছে। নিম্নমানের মালামাল দিয়ে কাজ চলছিল সে বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে বিএনপি রফিক বলেন, না জানাই নাই। আমাদের এমপি সাব বলছে যার যার এলাকার কাজ তারা বুইজা রাখবা। কাজ বন্ধ করার ক্ষমতা রাখেন কিনা জানতে চাইলে ওই নেতা বলেন, ‘আমাদের এলাকার কাজ আমরা বুইঝা রাখবোনা। নিম্নমানের কাজ হলে বাঁধা দেবোনা?’ তাদের(বিএনপি নেতাদের) ছাড়া কেউ কাজ করতে পারবেনা বলে হুমকি প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে এই নেতা বিষয়টি অস্বীকার করেন।

এবিষয়ে শরীয়তপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, প্রকৌশলীকে মারধরের বিষয়টি তিনি অবগত নয়। তবে, যেসকল সাইটে নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করে ব্লক তৈরী করা হয় সেগুলো তারা অবগত হওয়ার সাথে সাথে ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। এছাড়াও যদি তাদের অগোচরে নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করে কোন সাইটে ব্লক তৈরী করা হয়ে থাকে তা তাদের টাস্কফোর্সের সর্বশেষ টেস্টে উত্তীর্ণ না হলে সেগুলো বাতিল করে দেয়া হবে।

স্থানীয় বিএনপি নেতাদের কর্তৃক কাজ বন্ধ ও হুমকি প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এবিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি আইনানুগ ব্যবস্থা নিবে এবং আমরা সহযোগীতা করব।’’

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন