

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান কীটনাশক ব্যবহার, মৌপতঙ্গের মৃত্যু, প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে রাজশাহীতে নীতি আলোচনা ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে বক্তারা পরাগায়নকারী পতঙ্গ রক্ষায় জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন, উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিষিদ্ধকরণ এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার প্রসারের দাবি জানান।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজশাহী নগরীর এসকে ফুড সেমিনার হলে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ও গ্রিন কোয়ালিশন-রাজশাহীর যৌথ আয়োজনে “বাংলাদেশের নীরব পরাগসংকট: কীটনাশকনির্ভর কৃষি, মৌপতঙ্গের মৃত্যু ও পরিবেশগত বিপর্যয়” শীর্ষক নীতি আলোচনা ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরিবেশ ও প্রাণীবিজ্ঞানী, কৃষি গবেষক, মানবাধিকার কর্মী, মৌচাষী এবং মাঠপর্যায়ের কৃষক প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন গ্রিন কোয়ালিশন-রাজশাহীর সভাপতি ও নদী-পরিবেশ গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী। পরে “বাংলাদেশের নীরব পরাগসংকট, বিষাক্ত কীটনাশক ও পরিবেশ বিপর্যয়: বরেন্দ্র অঞ্চলে কীটনাশকজনিত পরাগায়নকারী পতঙ্গের হ্রাস ও পরিবেশ অবক্ষয়-বহুপ্রজাতিক সংকট, কৃষি-রাসায়নিককরণ” শীর্ষক নীতিপত্র উপস্থাপন করেন বারসিকের গবেষক ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম।
নীতিপত্র উপস্থাপনকালে তিনি বলেন, এগ্রোইকোলজি বা পরিবেশসম্মত কৃষিচর্চা সম্প্রসারণ করা গেলে বহুপ্রজাতিক সংকট ও পরাগায়নকারী পতঙ্গের বিলুপ্তি রোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক পর্যায়ে খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হবে। তিনি জাতীয়ভাবে পরাগায়নকারী পতঙ্গ সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান।
বক্তারা বলেন, মানুষের খাদ্যতালিকায় থাকা ডাল, সরিষাসহ বিভিন্ন তৈলবীজ, শাকসবজি ও অধিকাংশ ফলমূল উৎপাদন প্রাকৃতিক পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কৃষিক্ষেতে অতিরিক্ত বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে মৌমাছি, ভোমরা ও অন্যান্য পরাগবাহী পতঙ্গের স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি আগাছানাশকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মাঠের আইল, রাস্তার ধারের বন্য ফুল ও ঝোপঝাড় ধ্বংস হচ্ছে, ফলে এসব পতঙ্গ খাদ্য ও আবাসস্থল হারাচ্ছে।
তাদের মতে, এর ফলে স্থানীয় জাতের ফসলের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কৃষকরা ধীরে ধীরে নিজস্ব বীজব্যবস্থা হারিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির হাইব্রিড বীজ ও রাসায়নিকনির্ভর কৃষির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। যা দেশের খাদ্য সার্বভৌমত্বের জন্যও হুমকি।
প্রাণীবিজ্ঞানী ড. বিধান চন্দ্র দাস বলেন, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ হাজার প্রজাতির মৌপতঙ্গ নথিভুক্ত হলেও বাংলাদেশে কোন কোন প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে বা সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও তথ্যভান্ডার নেই। তিনি এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা জোরদার এবং পরাগবাহী পতঙ্গ সংরক্ষণে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান।
মৌচাষী মো. শফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা ও তীব্র তাপদাহ মৌমাছির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, মৌমাছির উপযোগী তাপমাত্রা ২৬ থেকে ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর বেশি তাপমাত্রা হলে মৌমাছির মৃত্যু ও মধু উৎপাদন কমে যায়।
আরেক মৌচাষী মো. শফিকুল ইসলাম রঞ্জু বলেন, পবা উপজেলায় মধু সংগ্রহের জন্য স্থাপিত তার ১২০টি মৌবক্সের মৌমাছি কীটনাশকের কারণে মারা গেছে। সবজি ক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগের ফলে অজান্তেই মৌমাছিগুলো বিষক্রিয়ার শিকার হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
পবা উপজেলার কৃষক মো. মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমানে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন বা কুমড়াজাতীয় ফসলে অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে পরাগায়ন করতে হচ্ছে। আগে ভোমরা, মৌমাছি ও অন্যান্য পতঙ্গ স্বাভাবিকভাবে এ কাজ করত। কিন্তু এখন এসব পতঙ্গের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার ও দেশীয় গাছপালা কমে যাওয়াকে তিনি এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
কৃষাণী সুলতানা খাতুন বলেন, আগের মতো বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ আর দেখা যায় না। বিশেষ করে কালো ভোমরা প্রায় হারিয়ে গেছে।
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান আতিক বলেন, কৃষিতে ব্যবহৃত অনেক কীটনাশক পরাগবাহী পতঙ্গের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ফুল ফোটার সময় নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগের কারণে মৌপতঙ্গ সরাসরি বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছে। এ সংকটকে শুধু কৃষি উৎপাদনের সমস্যা হিসেবে না দেখে পরিবেশগত ও বাস্তুতান্ত্রিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠান থেকে সাত দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও নিষিদ্ধ কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ, জাতীয় পরাগায়নকারী সুরক্ষা নীতি প্রণয়ন, এগ্রোইকোলজি ও পরিবেশবান্ধব কৃষির প্রসার, বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য বিশেষ পরিবেশ সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ, কৃষকদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নিরাপদ কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, পরাগবাহী পতঙ্গ ও প্রাণবৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণে জাতীয় ব্যবস্থা চালু এবং গবেষণা, গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরাগসংকটকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান।