সোমবার
০২ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সোমবার
০২ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হাতিয়ায় দশ দলের হান্নান, বিএনপির ত্রিমুখী লড়াই

আরিফ সবুজ, নোয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৩ এএম
হান্নান মাসুদের প্রচারণা
expand
হান্নান মাসুদের প্রচারণা

দেশের সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে অন্যতম হাতিয়া দ্বীপ৷ সাগর, নদী, বন আর মেঘনার ভাঙনের বুকে জেগে উঠা পলিমাটির নতুনচর৷ মনপুরা, ভোলা , সন্দ্বীপ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সেন্ট মার্টিন্স আর হাতিয়া৷ দেশের এ সাতটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের ৭ম আশ্চর্য এটি৷ প্রকৃতির প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠা এখানকার মানুষের রাজনীতিও ভিন্ন৷ দলীয় প্রতিকের চেয়ে বিদ্রোহী কিংবা বিরোধী দলের শক্ত অবস্থান থাকে সবসময়ই৷

পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৯১

বিএনপি ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৪০টি আসন লাভ করে৷ বিএনপি সরকার গঠন করলেও এখান থেকে সংসদে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মোঃ ওয়ালী উল্লাহ৷ এতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৫১.২% ভোট পায়, আর বিএনপির আবু সুফিয়ান ভোট পেয়েছিল মাত্র ৭.৫%৷ সে তুলনায় এগিয়েছিল বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী৷ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে আবুল হোসেন পেয়েছিলেন ৯.৮% ভোট৷ তখন নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দ্বিতীয় হয়েছিলেন মোঃ আলী৷ নাঙ্গল প্রতীকে তিনি নির্বাচন করেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি থেকে ৷ পেয়েছিলেন ২৯.৩% ভোট৷

ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৯৬ (১২ দিনের সরকার)

অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল নির্বাচনটি বর্জন করেছিল। মোট ভোট গৃহীত হয়েছিল মাত্র ২১%। রাজনৈতিক মহলে নির্বাচনটি ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নামে পরিচিত। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনে জয় লাভ করে এবং ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৭৮টি আসন লাভ করে। আদালতের রায়ে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছিল। নোয়াখালী ৬ আসনে তখন মাত্র ১২ দিনের জন্য সংসদ সদস্য হয়েছিলেন প্রকৌশলী ফজলুল আজিম৷

সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন জুন, ১৯৯৬

এতে ৩০০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে জোটগতভাবে সরকার গঠন করে। কিন্তু হাতিয়ায় ঘটে উল্টো ঘটনা৷ চিরাচরিতভাবে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করলেও বিএনপির ফজলুল আজিম এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন৷ ফজলুল আজিম পান ৩৫.৫% ভোট, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মোঃ ওয়ালী উল্লাহ পান ৩২.২% ভোট৷ জামায়াতে ইসলামী তখন পান মাত্র ১.৫% ভোট ৷

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০১

এ সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের বিপরীতে ১৯৩টি আসন পেয়েছে বিএনপি৷ তবে, সরকারে বিএনপি গেলেও হাতিয়ার নেতৃত্ব পান সাবেক জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মোঃ আলী৷ মোঃ আলী স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ৩৭.২% ভোট পায় এবং আওয়ামী লীগের ওয়ালী উল্যাহ ৩২.৮% ভোট পেয়েছেন৷ বিএনপি জামায়াত জোটের মোঃ ফজলুল আজিম পায় ২৮.১% ভোট৷

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০৮

এবছর সারা দেশে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হলেও ভরাডুবি ঘটে হাতিয়ায়৷ সাবেক জাপা নেতার স্ত্রী আওয়ামী সমর্থনে সতন্ত্র প্রার্থী হলে বিএনপির সাবেক এমপি ফজলুল আজিম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়৷ এতে তার কাছে হেরে যায় আয়েশাসহ বিএনপির মোঃ শাখাওয়াত হোসেন৷ টালমাটাল এ হাতিয়ায় বিএনপি ভোট পায় মাত্র ৬৮০টি৷ অথচ প্রায় তিনগুনের মতো এজেন্ট ছিল ধানের শীষের৷ এসময় ধানের শীষে ভোট পড়ে ০.৫%৷ স্বতন্ত্র বিজয়ী ৫১.২% ও প্রতিদ্বন্দ্বী আয়েশা আলী পেয়েছে ৪৭.৭% ভোট৷

দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন৷

রাতের ভোট দিনে, আমি তুমি আর ডামি মিলে এ তিনটি নির্বাচন দেশ-বিদেশে বিতর্কিত হয়৷ দশম জাতীয় সংসদে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও হাতিয়ার চলে আমি ডামির তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা৷ নৌকার বেগম আয়েশা ফেরদাউস ৬৭,৫৪৭ ভোটে বিজয়ী হয় আর ডামির মোঃ আমিরুল ইসলাম পায় ৩০,৯১৯ ভোট৷ তুমি তথা জাপা'র আনোয়ারুল আজিজ পায় ৪০৪ ভোট৷

২০১৮'র নির্বাচন৷ এটার ইতিহাস দিনের ভোট রাতেই শেষ হয়৷ বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মোঃ ফজলুল আজিম সকাল ১০টায় ভোট বর্জন করেন৷ মোঃ আলী রাতেই অর্জন করেন আসনটি৷

২৪'শে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী এক লাখ ৯৩ হাজার ৭১৫ ভোটে সিল মারেন আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মুশফিকুর রহমানের জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে সিল পড়ে মাত্র পাঁচ হাজার ৯৩৬টিতে ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি ও বিদ্রোহীদের হাল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নোয়াখালীর হাতিয়ার এলাকায় অবস্থিত নোয়াখালী-৬ আসনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে৷ এখানে বিএনপির ধানের শীষ পেয়েছেন দলটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম৷ তাকে উপেক্ষা করে বিএনপি থেকে চুড়ান্ত বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছে সাবেক সংসদ সদস্য মোঃ ফজলুল আজিম ও নোয়াখালী জেলা বিএনপির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার তানভীর উদ্দিন রাজিব৷

বুধবার (১১ জানুয়ারি) দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল করিব রিজভী স্বাক্ষরিত বিএনপি'র ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে এক বিজ্ঞপ্তিতে হাতিয়ার এই দুই বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কার করে বিএনপি৷

এবিষয়ে হাতিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক খোকন এনপিবিকে জানান — হাতিয়ায় বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী তানভীর একসময় জামাত করতেন৷ তিনি গুপ্ত ছিলেন৷ অন্যদিকে মোঃ ফজলুল আজিমের বয়স হয়েছে৷ তিনি হাঁটাচলা করতে পারেন না৷ হাতিয়ায় তিনি তিনবার এমপি ছিলেন৷ বিদ্রোহীতার কারনে দল তাদের বহিষ্কার করেছেন৷ আমরা আশাবাদী ধানের শীষের প্রার্থী মাহবুবুর রহমান শামীম শতভাগ বিজয়ী হবে এ ব্যাপারে আমরা আশাবাদী৷

হান্নান মাসুদ সম্পর্কে জানতে চাইলে এ নেতা বলেন — তাকে বিএনপি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে না৷ তার অধিকাংশ বক্তব্যই মিথ্যা৷ তিনি যে সকল উন্নয়নের কথা বলেছেন সেগুলো অনেক আগেই মোহাম্মদ আলীর আমলে পাস করা৷ হানান মাসুদ আওয়ামী লীগের আমলে হওয়া কাজগুলোকে নিজের বলে দাবি করছে৷ এবং সকল প্রার্থীর মধ্যে তিনি কম শিক্ষিত৷

শাপলা কলিকে প্রষ্ফুটিত করতে ১০ দলীয় ঐক্য—

এ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদকে সমর্থন জানিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহ মোহাম্মদ মাহফুজুল হক।

এ বিষয়ে জামায়াতের শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনে সভাপতি এডভোকেট জহির উদ্দিন এনপিবিকে জানান— জোটের সিদ্ধান্ত ও দলের নির্দেশনার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে হাতিয়ায় জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী পরিবর্তন করেছে ৷ এ শ্রমিক নেতা আরও বলেন — শুধু পরিবর্তন নয়; জোটের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে সবরকমের প্রচেষ্টা চালাবে জামায়াতে ইসলামী ৷ শুধু জামায়াত নয়; জোটের জন্য কাজ করছেন খেলাফত আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, এনসিপি, এলডিপিসহ অন্যরা৷

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন