

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


মহাদেব শিবকে তুষ্ট করতে নড়াইলে আগুন-সন্ন্যাসী পূজা হয়েছে। এ সময় জ্বলন্ত অগ্নিপথে খালি পায়ে হাটেন সন্ন্যাসীরা। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাত ১০ টার দিকে নড়াইল সদর উপজেলার মুলিয়া ইউনিয়নের কোড়গ্রাম বারোয়ারী মন্দির চত্তরে এ পূজা করা হয়। এতে ১৬ জন সন্ন্যাসী অংশ নেয়।
সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, মাটি খুঁড়ে তৈরি করা হয়েছে লম্বা একটি গর্ত। সেই গর্তে ফেলা হয়েছে কয়েক মণ কাঠ। আগুন জ্বালানোর জন্য দেওয়া হয়েছে কিছু পাটকাটি। আর ওই কাট আগুনে পুড়ে পরিণত হয়েছে জ্বলন্ত অগ্নিপথে। খালি পায়ে, নির্ভয়ে সেই পথ দিয়ে হেটে যাচ্ছেন একে একে সন্ন্যাসীরা। ঢাক-ঢোল আর শঙ্খধ্বনির তালে তাল মিলিয়ে, ভক্তিময় পরিবেশে কিছু সময় ধরে চলে সেই অগ্নিপথে হেটে চলা। ভক্তদের চোখে বিস্ময় আর মুখে প্রার্থনা।
হিন্দু ধর্মালম্বীদের কাছে এটি আগুন-সন্ন্যাস পূজা নামে পরিচিত। তারা বলেন, মহাদেব শিবকে তুষ্ট করতে প্রতিবছর বাংলা বছরের শেষ সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন পূজার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো আগুন-সন্ন্যাস পূজা। চৈত্রসংক্রান্তির রাতে এই পূজা করা হয়। কাঠ পুড়িয়ে জ্বলন্ত পথ তৈরি করে তার ওপর দিয়ে হেটে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মহাদেব শিবের আরাধনা করা হয়। সেই সাথে সমাজের শান্তি, কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করা হয়।
পরিমল পরামান্য নামে এক সন্ন্যাসী বলেন, আগুন-সন্ন্যাস শুধু মাত্র শারীরিক সাহসের নয়, মানসিক ও আধ্যাত্মিক শুদ্ধতারও এক প্রতীক। সারা দিন উপোস থাকা, মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সকল ধরনের খারাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা এই সবই এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণের সাধনা। এই আচার মূলত আত্মসর্গ ও বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ, যেখানে বিশ্বাস করা হয় মহাদেব শিবের কৃপায় আগুনও কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এ ধরনের রীতি সাধারণত আত্মশুদ্ধি, ঈশ্বরের প্রতি অটল ভক্তি এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবেই দেখা হয়।
আগুন-সন্ন্যাস দেখতে আসা একজন বলেন, প্রতিবছর আমাদের এখানে আগুন-সন্ন্যাস পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পূজা সচরাচর সব জায়গায় হয় না। তাই অনেক মানুষ এটি দেখতে এখানে আসেন। এই পূজার মধ্য দিয়ে আমরা ভগবান শিবের কাছে চাই তিনি আমাদের সকলের মঙ্গল করুক।
এর আগে বিকেল সাড়ে ৪ টার দিকে একই এলাকায় বিদ্যুত মল্লিকের বাড়ির আঙ্গিনায় খেজুর সন্ন্যাসী পূজা করা হয়। এতেও ১৬ জন সন্ন্যাসী অংশ নেয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কাটাযুক্ত খেজুর গাছের নিচে বাজানো হচ্ছে ঢাক-ঢোল। সেই সাথে চলছে উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি। এক দল সন্ন্যাসী খেজুর গাছ জড়িয়ে ধরে আছে। আর দল নেতা পুরোহিত সাদা ধুতি আর লাল গামছা কোমরে জড়িয়ে হাতে থাকা ছড়ি খেজুর গাছে লাগিয়ে করছেন মন্ত্র পাঠ। কয়েকশত মানুষ গাছের চারিপাশ ঘিরে অপলক দৃষ্টিতে দেখছেন এ দৃশ্য।
এরই মধ্যে ১ জন সন্ন্যাসী উঠে পড়েছে খেজুর গাছের মাথায়। পর পর সারি সারি গাছটিতে উঠে পড়ছে আরো কয়েকজন সন্ন্যাসী। গাছের মাথায় দাঁড়িয়ে খেজুর ছুড়ে দিচ্ছেন ভক্ত ও দর্শনার্থীদের দিকে। প্রসাদ হিসেবে এ খেজুর পেয়ে খুশি ভক্তরা।
খেজুর সন্ন্যাসী পূজায় অংশ নেওয়া সন্ন্যাসী সুদর্শন চক্রবর্তী বলেন, চৈত্র মাসে যখন পাট স্নান করানো হয়। তখন থেকে আমরা মহাদেব শিব ঠাকুরের নামে উপোস থাকি। নিয়মিত পূজা অর্চনা করি। তিনি আরও বলেন, শিবভক্ত বানরাজ তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে নাচ-গান করেন। শরীর হতে রক্ত বের করে তার ছেলের উদ্দেশ্য সমর্পণ করেন। বানরাজের রক্ত উপহার পেয়ে শিব খুশি হয়। শিবকে তুষ্ট করতেই আমাদের এত আয়োজন।
চৈতী মল্লিক নামে এক নারী বলেন, এখানে প্রতিবছর শিব পূজা উপলক্ষে খেজুর সন্ন্যাসী, কাটা সন্ন্যাসী, আগুন সন্ন্যাসী হয়। আগামি কাল মঙ্গলবার নীল পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
পূজার পুরহিত সচিন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, চৈত্র মাসে শিব যখন রুদ্র রুপ ধারন করেন। রুদ্র রুপ ধারনকারী শিব রাহুসেন রাজাকে ষোল সন্ন্যাসী বালা উপস্থিত করে পাট স্নান করিয়ে উপাসনা করার আদেশ দেন। সেই থেকে এই পূজা শুরু হয়। ভক্তরা চৈত্র মাসে এই পূজা করে থাকেন। মহাদেব শিবকে তুষ্ট করেতেই এই পূজার আয়োজন।
মন্তব্য করুন