

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর ইউনিয়নের ভূঁইয়াপাড়া এলাকার জনস্বার্থে সদ্য নির্মিত ও ব্যবহৃত একটি বাইপাস সড়ক নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বাইপাস সড়কটি পাকা করায় ওই এলাকার পাঁচটি গ্রামের বাসিন্দা ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিনের যাতায়াতের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেয়েছে। তবে সড়কের প্রবেশমুখে কুমারবাড়ি এলাকার জমির মালিকানা দাবি করে স্থানীয় লুৎফে হাবিব রুবেল গং জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন।
সরেজমিনে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্রিটিশ আমল থেকে ষোলঘর বাজার থেকে কুমারবাড়ির ওপর দিয়ে ভূঁইয়াপাড়া পর্যন্ত একটি স্বল্প প্রশস্তের নিচু একটি পায়ে হেঁটে চলার পথ ছিল। এই পথ দিয়ে মুন্সীপাড়া, আম্বারপাড়া, বাকিয়া পাড়া, ভূঁইয়া পাড়া ও শ্যামাপাড়া গ্রামের মানুষ কষ্ট করে চলাচল করতেন। সংকীর্ণ ওই রাস্তা দিয়ে কোনো যানবাহন চলাচল করতে না পারায় পাঁচ গ্রামের মানুষকে নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল বহন করে বাড়িতে পৌঁছাতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো। রাস্তার পাশের বাড়িগুলোর বাসিন্দাদের কেউ মারা গেলে মরদেহ বহন করতেও ভোগান্তির শেষ থাকত না।
এই পরিস্থিতিতে ২০০৪ সালে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে ১৬ ফুট রাস্তা করে ইট বিছানো হয়। কিন্তু কুমারবাড়ির জমির মালিকানা দাবি করে আওয়ামী লীগের ঢাকা জেলা শাখার সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান ২০০৭ সালে রাস্তার প্রবেশমুখে সীমানা প্রাচীর তুলে দিয়ে রাস্তার ইট তুলে নেন। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাস্তা কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে কুমারবাড়ির জমি খাস খতিয়ানভুক্ত দাবি করে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিকার চান। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে জেলা প্রশাসন হাইকোর্টের মাধ্যমে কুমারবাড়ির ২৪ শতাংশ জমির মধ্যে ১২ শতাংশ জমি খাস খতিয়ানভুক্ত হিসেবে বুঝে পায়।
এলাকাবাসীর প্রয়োজন বিবেচনায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থের একটি বাইপাস সড়ক নির্মাণ করে। সড়কের প্রবেশমুখে যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচলের সুবিধার্থে তা ১২ ফুট থেকে বাড়িয়ে ১৬ ফুট করা হয়েছে।
এ বিষয়ে শ্রীনগর উপজেলা প্রকৌশলী মো. মহিফুল ইসলাম জানান, প্রাক্কলন অনুযায়ী সড়কটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে সড়কটি ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি এলাকার আর্থ-সামাজিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়েছে।
ষোলঘর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার ওহিদুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সড়কটি নির্মাণের আগে নিচু ও কাঁচা রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচল করত। ইট বিছিয়ে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে ২০০৭ সালে আওয়ামী লীগের তৎকালীন বৃহত্তর ঢাকার সভাপতি অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান এতে বাধা দেন এবং রাস্তার ইট তুলে নেন। নতুন ৩০০ মিটার সড়কের পাশে থাকা প্রতিটি বাড়ির মালিক স্বেচ্ছায় রাস্তার জন্য জমি ছেড়ে দিয়েছেন। শুধুমাত্র কুমারবাড়ির জমির মালিকানা দাবি করে ভূমিদস্যু রুবেল গং রাস্তা নির্মাণে বিরোধিতা করছেন।
তিনি আরও বলেন, রাস্তার মধ্যে সাবেক শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের নিজস্ব পৈতৃক ভিটার জমিও রয়েছে। এখন যারা রাস্তা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করছেন, তারা এলাকায় ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত। প্রায় ২১ বছর ধরে স্থানীয়দের নামে মামলা দিয়ে রাস্তার উন্নয়ন কাজে বাধা দেওয়া হচ্ছে। দেশভাগের পর জমিটি খাস খতিয়ানভুক্ত হিসেবে রেকর্ড হলেও হাবিবুর রহমান ও রুবেল গং দলিল সৃষ্টি করে জমির মালিকানা দাবি করে দীর্ঘদিন ধরে মামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মাকসুদা বেগম বলেন, মানুষের সুবিধার জন্য এই রাস্তায় আমাদের ১০ শতাংশ জমি চলে গেছে। এতে কোনো আফসোস নেই, মানুষের উপকার হয়েছে। আগে কাঁচা রাস্তা থাকায় মানুষকে কাঁদা ও পানির মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে হতো। এখন দিন-রাত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করতে পারছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার এক বাসিন্দা জানান, রুবেল ও হাবিব গং এলাকার অনেক জমি দখল করে রেখেছে। তাদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না। প্রশাসনের কাছে এই ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এদিকে কুমারবাড়ির জমির মালিকানা দাবি করে অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমানের ছেলে লুৎফে হাবিব বলেন, ষোলঘর বাজার থেকে আসা শাখা রাস্তা ১০ ফুট এবং নতুন রাস্তা ১২ ফুট থাকার কথা থাকলেও আমাদের জমির ওপর দিয়ে ১৮ ফুট রাস্তা করা হয়েছে। প্রশাসন এতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়ম না মেনে রাস্তা নির্মাণ করেছে, যা কাম্য নয়। আমাদের ওপর জুলুম করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক সৈয়দা নূরমহল আশরাফী বলেন, কুমারবাড়ির জমির মোট পরিমাণ ২৪ শতাংশ। এর মধ্যে আদালতের রায় অনুযায়ী ১২ শতাংশ জমি খাস করা হয়েছে। কালেক্টরেট হিসেবে সেখানে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছিল। সম্প্রতি আদালতের স্থিতাবস্থা রয়েছে জানতে পেরে সাইনবোর্ডটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
মন্তব্য করুন