

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


মাদারীপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পূর্ব দিকে অবস্থিত এক শান্ত জনপদ— ছিলারচর ইউনিয়নের আউলিয়াপুর গ্রাম। একসময় গভীর বনজঙ্গলে ঘেরা এই এলাকায় বিভিন্ন স্থান থেকে এসে সাধকেরা ধ্যান করতেন বলে আউলিয়াপুরের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। এই গ্রামেই রয়েছে সুফি সাধক হযরত শাহ সুফী খাজা ইউসুফ শাহ আহসানের দরগা শরিফ, যা আজ অবহেলায় জরাজীর্ণ।
তবে এই দরগার ঠিক পাশেই লুকিয়ে আছে ইতিহাসের এক রক্তাক্ত ও নির্মম অধ্যায়। সেখানে আকাশের দিকে মুখ করে আজও দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৪০ ফুট উঁচু একটি চিমনি। এটি কোনো সাধারণ চিমনি নয়, এটি আড়াইশ বছরের পুরনো এক পুরাকীর্তি— ইংরেজ নীলকর ডানলপ সাহেবের নীলকুঠির চুল্লির চিমনি, যা কৃষকদের ওপর ব্রিটিশদের চালানো অমানুষিক নির্যাতনের নীরব সাক্ষী বহন করে চলেছে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, এই অঞ্চলের মাটি অত্যন্ত ঊর্বর হওয়ায় ১৮০০ সালের দিকে ইংরেজরা আউলিয়াপুরে প্রায় ১২ একর জমির ওপর একটি বৃহৎ নীলকুঠি স্থাপন করে। ১২ কক্ষবিশিষ্ট এই কুঠির ম্যানেজার ছিলেন ইংরেজ নীলকর ডানলপ সাহেব, আর তার বিশ্বস্ত গোমস্তা ছিল পাচ্চরের কালীপ্রসাদ নামের এক ব্যক্তি। নীলের ব্যবসা করে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার লালসায় ডানলপ এই অঞ্চলের কৃষকদের ধান বা অন্য ফসল বাদ দিয়ে জোরপূর্বক নীল চাষে বাধ্য করেন। নীল চাষের ফলে জমির ঊর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়ে অন্য ফসল ফলত না বলে কৃষকরা বাধা দিলেও, তাদের ওপর চলত অমানুষিক জুলুম ও নির্যাতন।
কুঠিয়াল ও জমিদারদের এই চরম অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ফরায়েজী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হাজী শরীয়তউল্লাহ (যার নামে পরবর্তীতে শরীয়তপুর জেলার নামকরণ করা হয়)। ১৮৪০ সালের ১৮ জানুয়ারি তার মৃত্যুর পর এই আন্দোলনের নেতৃত্ব নেন তার যোগ্য পুত্র পীর মহসিনউদ্দিন দুদু মিয়া। অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়তে তিনি ফরিদপুরের বিখ্যাত লাঠিয়াল জালালউদ্দিন মোল্লার মাধ্যমে এক শক্তিশালী লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তোলেন। ১৮৪১ ও ১৮৪২ সালে দুদু মিয়ার লাঠিয়াল বাহিনী কানাইপুর ও জয় নারায়ণ ঘোষের জমিদার বাড়িতে আক্রমণ করে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। এরপর ১৮৪৫ সালের ৫ ডিসেম্বর দুদু মিয়ার নেতৃত্বে বিশাল লাঠিয়াল বাহিনী আউলিয়াপুরের এই কুখ্যাত ডানলপ সাহেবের নীলকুঠিতে আক্রমণ চালায়।
৯০ বছর বয়সী প্রবীণ সিরাজ ফরায়জী সেই পুরনো দিনের লোকইতিহাস মনে করে জানালেন, 'আক্রমণের খবর পেয়ে নীলকুঠিয়াল বাহিনীর একটি বড় অংশ পালিয়ে যায়। কুঠির পূর্ব দিকে ‘রণখোলা’ নামক স্থানে দুপক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়, যাতে ডানলপ বাহিনী চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়।' এই দীর্ঘ আন্দোলনের ফলেই মূলত ১৮৪৭-৪৮ সালের দিকে লোকসানের মুখে পড়ে এই অঞ্চলে নীল চাষের অবসান ঘটে এবং কৃষকরা অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পায়।
কালের বিবর্তনে স্বাধীনতার আগে ঘনজঙ্গলে ঘেরা সেই ১২ একরের নীলকুঠির বেশিরভাগ জমিই এখন বেদখল হয়ে গেছে, গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি। কুঠির মাঝখানের সেই নীল তৈরির চুল্লি আর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ৪০ ফুট উঁচু চিমনি ছাড়া আজ আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাও এখন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে।
স্থানীয় ৬০ বছর বয়সী ফিরোজা খাতুন বললেন, 'শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে শুনেছি, ইংরেজরা এখানে নীল বানাত। কাজ করতে রাজি না হলে কৃষকদের তো বটেই, তাদের ছোট ছোট বাচ্চা আর পরিবারকেও মারধর করা হতো। এই চিমনিটা দেখতে প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে। এটি যদি সরকারিভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা হতো, তবে মানুষ এসে অন্তত দেখত যে ইংরেজরা আমাদের কৃষকদের ওপর কেমন অত্যাচার করেছিল।' আরেক বাসিন্দা আবদুল ওহাব সরদারের আক্ষেপ, 'অনেক বড় বড় কর্মকর্তা এসে দেখে গেছেন, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কাজের কাজ কিছুই হয়নি।'
ছিলারচর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান তৌফিক আকন এবং মাহমুদপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাজাহান ঢালি ঐতিহ্যটি ধরে রাখার তাগিদ দেন। তার মতে, 'এই দৃশ্যমান ঐতিহাসিক নিদর্শনটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। এটিকে এখনই সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ না করলে একসময় ইতিহাস থেকে এই অঞ্চলের ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যাবে।'
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ডক্টর মর্জিনা খাতুন এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি নিয়ে ইতিবাচক আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তার ভাষ্য, 'আমি নিজে এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করব। এরপর পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত মোতাবেক দ্রুত এই নীলকুঠির চিমনি ও তার চারপাশ সংস্কারের কাজ শুরু করব।'