শুক্রবার
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উদ্বোধনের পর থেকেই বন্ধ শিবচর ট্রমা সেন্টার

মো. সিরাজুল ইসলাম, শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৪০ পিএম
ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ট্রমা সেন্টার
expand
ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ট্রমা সেন্টার

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশেই দূর্ঘটনা ঘটে। দূর্ঘটনায় মানুষ হতাহত হয়। এটি আধুনিকতার অবশ্যম্ভাবী অভিশাপ। আর এ অভিশাপ তথা দূর্ঘটনা কবলিত হতাহতদের নিরবিচ্ছিন্ন সেবা দানের জন্যই ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের শিবচর অংশে নির্মাণ করা হয়েছে ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ট্রমা সেন্টার।

কিন্তু উদ্বোধনের তিন বছর অতিক্রান্ত হলেও সক্রিয় করা সম্ভব হয়নি সেন্টারটি। ফলে এক্সপ্রেসওয়ের পাশেই কয়েকটি সুদৃশ্য ভবন নির্মাণ করে রাখলেও কোন সেবা মিলছে না।ফলে এটি এখন ভবঘুরে ও মাদক সেবীদের মিলন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ টি জেলার মানুষ সময় বাঁচিয়ে তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে এ এক্সপ্রেসওয়েটি ব্যবহার করছেন।

তবে এ এক্সপ্রেসওয়েটি ব্যবহার করতে গিয়ে গাড়ীর দ্রুত গতির কারণে অহরহ ঘটছে দূর্ঘটনা। ফলশ্রুতিতে মুহূর্তেই নিভে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের অমূল্য প্রাণ। কেউবা আবার পঙ্গুত্ব বরণ করছেন সারা জীবনের জন্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পঙ্গুত্ব বরণের হাত থেকে রক্ষার জন্যই ২০২২ সালে এক্সপ্রেসওয়ের শিবচর অংশে নির্মাণ করা হয় ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ট্রমা সেন্টার।

যেখানে চিকিৎসকসহ ৩৪ টি পদে লোকবল থাকার কথা। কিন্তু জনবল নিয়োগ না হওয়ায় কর্তৃপক্ষ এখনও সেন্টারটি সচলই করতে পারেনি। আর এ সুযোগে এখানে দিনের আলোয় স্থানীয় কৃষাণ-কৃষাণীরা তাদের গৃহস্থালীর কাজ করেন।আর রাতে বসে মাদকসেবীদের মিলন মেলা।

মাদারীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১১ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় নির্মিত ট্রমা সেন্টারটিতে ২ জন আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা,৩ জন অর্থপেডিক্স সার্জন,২ জন অ্যানেসথেসিস্ট,৭ জন কনসালট্যান্টসহ ১৪ জন চিকিৎসক। তাছাড়া ১০ জন নার্সসহ ফার্মাসিস্ট,রেডিও গ্রাফার ও টেকনিশিয়ানসহ ২০টি। সবমিলিয়ে ৩৪ টি পদে জনবল নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো কোন পদেই নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

শিবচর হাইওয়ে পুলিশের তথ্য মতে, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে (২৫ জুন ২০২২) এ পর্যন্ত শিবচর উপজেলাধীন এক্সপ্রেসওয়েতে ১৬৭ টি দূর্ঘটনায় ১৮৩ টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এ সময় ১৩৭ জন নিহত ও ১৭১ জন আহত হয়েছেন। এতে মামলা হয়েছে ৬২টি।তাছাড়া

স্থানীয়দের অভিযোগ, গাড়ীর দ্রুতগতির কারণেই প্রায়ই এ এক্সপ্রেসওয়েতে দূর্ঘটনা ঘটে এবং আহত - নিহত হয়। আশে পাশে কোন চিকিৎসালয় না থাকায় ঢাকা বা ফরিদপুর মেডিক্যালে নিতে নিতে মাঝ পথেই অনেকের জীবন তরী সাঙ্গ হয়ে যায়।

এই ট্রমা সেন্টারটির প্রাঙ্গণজুড়ে এখন ঝোপ-জঙ্গল আর আগাছা। মূল ফটকে তালা ঝুলানো থাকলেও দেয়াল টপকে ভেতরে ঢোকে মাদকসেবীরা। ভবনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ ফ্যান, বাতি বৈদ্যুতিক জিনিসপত্র, এসি নষ্ট হওয়ার উপক্রম।তাছাড়া কয়েক দফায় চুরি ও হয়েছে। এ নিয়ে স্হানীয়রা চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, ট্রমা সেন্টারটির মরিচা ধরা লোহার গেটে তালা ঝুলছে। প্রবেশদ্বার ছেয়ে গেছে গাছপালা, আগাছা আর ঝোপঝাড়ে। ভবনের বেশির ভাগ জানালার কাচ ভাঙা, ফ্রেমগুলোতে মরিচা পড়ে নষ্ট হচ্ছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দেওয়ালের রং। আশপাশে কোনো নিরাপত্তাকর্মীকে দেখা যায়নি।

স্থানীয়রা জানায়, বহিরাগত ছেলেরা ট্রমা সেন্টারের দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে মাদক সেবন করে। রাতে এদিকটায় ভূতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রতিষ্ঠানটি মানুষের কোনো কল্যাণেই আসছে না।

এ ব্যাপারে বন্দর খোলা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আজিজ জানান,ট্রমা সেন্টারটি চালু হলে আমরা সহজেই উন্নত চিকিৎসা নিতে পারতাম। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের অবহেলায় আমরা সেটি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। পাশাপাশি অযত্ন-অবহেলায় বিনষ্ট হচ্ছে কোটি-কোটি টাকার সরকারি সম্পদ।

এদিকে এক্সপ্রেসওয়ের পাশেই নির্মাণ করা ট্রমা সেন্টারটিতে চিকিৎসাসেবা চালু না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন এই রুটে চলাচলরত পরিবহনচালক ও যাত্রীরা। তারা উদ্বেগিত কন্ঠে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট জানতে চেয়েছেন,এ ট্রমা সেন্টারের সূর্যোদয় হবে কবে?

সোনালী পরিবহনের যাত্রী জসিম মিয়া বলেন, আমি প্রতিনিয়ত এ মহাসড়ক দিয়ে ঢাকায় যাতায়াত করি। কিন্তু দুর্ঘটনায় কেউ আহত হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেয়ার স্থান নেই। তাই দ্রুত ট্রমা সেন্টার চালু হলে প্রাণহানি অনেক কম হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এটি জনস্বার্থে দ্রুত চালু করা।

এসড়কে দৈনন্দিন চলাচলকারী উৎরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো.আশরাফুল আলম বলেন , সড়ক পথে যেকোন দূর্ঘটনায় যত মানুষের মৃত্যু হয়, সাধারণত আহত হয় তার চেয়ে অনেক বেশী। দূর্ঘটনার পর ম্যানেজমেন্ট করতে দেরী হয়ে যাবার কারণে রক্ত ক্ষরণেই হয়তো মারা যাচ্ছে মানুষ, অথবা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অঙ্গের সংযোজন আর সম্ভব হয়ে উঠছে না। ফলে বেড়ে যাচ্ছে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা। এহেন দূঃসহ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য ট্রমা সেন্টারটি অনতিবিলম্বে সচল করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের নিকট জোর দাবী জানিয়েছেন।

মাদারীপুর সিভিল সার্জন ডা.মো.শরীফুল আবেদীন কমল বলেন, ট্রমা সেন্টারটি সচল করার জন্য প্রয়োজনীয় মোট ৩৪ পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করে চাহিদাপত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। যেহেতু এটা আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল সেহেতু এসব প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই দীর্ঘ সময় লাগে।আমরা আশাবাদী মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় অনুমোদন মিললে ট্রমা সেন্টারের কার্যক্রম শিগগিরই শুরু হবে।

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ট্রমা সেন্টারটি চালুর জন্য আমরা সার্বিকভাবে চেষ্টা চালাচ্ছি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় দাবিও জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি বিষয়টি মাননীয় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা মহোদয়ের অবগতিতেও আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই ট্রমা সেন্টারটি চালু হবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X