


ডাকাত আতঙ্কে দিন পার করছে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা। এলাকাটি নোয়াখালীর চাটখিল সংলগ্ন উপজেলা হওয়ায় ডাকাতদল খুব সহজে ডাকাতি করে সটকে পড়তে পারে। গত এক সপ্তাহে দুই জেলার সীমান্তবর্তী লক্ষ্মীপুরের বশিকপুরের দুই গ্রামের তিনঘরে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাস্থল জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার আওতাধীন। ঘটনাস্থলের পাশে দত্তপাড়া বাজারে একটি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র এবং পোদ্দার বাজারে পুলিশ ক্যাম্প রয়েছে।
এসব ঘটনায় কোন মামলা হয়নি, তবে ভুক্তভোগীদের মামলা কিংবা অভিযোগ করতে বলছে পুলিশ। এছাড়া স্থানীয় অপরাধীদের বিষয়ে তথ্যে দিতে বলছে বাহিনীটি।
বশিকপুর ইউনিয়নটি পূর্ব থেকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে ডাকাতির ঘটনায় এখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ডাকাতরা ঘরের বাসিন্দাদের আগ্নেয়াস্ত্র এবং ধারালো চুরির মুখে জিম্মি করে হাতমুখ বেধে মালামাল লুটে নেয়। ঘটনার সময় মারধরও করা হয়।
এলাকাজুড়ে যখন একের পর এক ডাকাতির ঘটনা সংঘটিত হয়, তখন স্থানীয় লোকজন নিজ উদ্যোগে দলবদ্ধ হয়ে রাত্রিকালীন পাহারার ব্যবস্থা করেছে- এমনটি জানিয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি।
সরেজমিনে সীমান্তবর্তী এলাকাটিতে ঘুরে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে ডাকাতির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
লক্ষ্মীপুরের বশিকপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব শেরপুর গ্রাম ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের খোদাওয়ান্দপুর গ্রাম। পাশের গ্রাম নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলার রাম নারায়ণ ইউনিয়নের পাঁচগরিয়া গ্রাম। পূর্ব শেরপুর গ্রামের পাকা সড়কের মধ্যে থাকা একটি কালভার্ট বিভক্ত করেছে দুই জেলাকে। ঠিক ওই কালভার্টের উপরই দিনে-রাতে বসে বখাটেদের মাদকের আড্ডাখানা৷ সরেজমিন গিয়ে সেই নমুনা লক্ষ্য করা গেছে।
ওই সীমানার একশ গজ দক্ষিণে মৃত আবুল বাশারের নতুন বাড়ি৷ বাড়ির আশেপাশে ফসলি মাঠ। বাড়িটি বশিকপুরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব শেরপুর গ্রামে পড়েছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) ভোররাত প্রায় ৪ টার দিকে সেহরী খেতে উঠেন মৃত আবুল বাশারের স্ত্রী মারজান বেগম (৪৫)। তিনি টিনের তৈরি ঘর থেকে বেরিয়ে ওজুর উদ্দেশ্যে ঘরের পাশে থাকা টিউবওয়েলের পাশে যান। ঘরের দরজাটি খোলা ছিল।
মারজাহান জানায়, মুখোশ পরিহিত ৮-১০ জন দুর্বৃত্ত তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। চার জন ঘরে ঢুকে, বাকীরা বাহিরে পাহারায় ছিল। ওই ঘরের একটি কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন তার ছেলে নির্মাণ শ্রমিক মো. আলামিন ও স্ত্রী বৃথী আক্তার। লোকজনের শব্দ শুনে তারা কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে দুর্বৃত্তরা তাদেরকেও অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। মারজাহান এবং তার ছেলে আল আমিনকে গামছা দিয়ে চোখ-মুখ বেধে ফেলে। আর আল আমিনের স্ত্রী বৃথীকে জিম্মি করে ঘরের মূল্যবান মালামাল তল্লাশি করে।
মারজাহান ও আল আমিন জানান, ডাকাতদল বৃথীর সাথে থাকা গলায় এবং কানের এক ভরি স্বর্ণ ছিনিয়ে নেয়৷ তার কাছে থাকা একভরি ওজনের চেইন নিয়ে নেয়। ঘরে চিকিৎসার জন্য থাকা নগদ ৫০ হাজার টাকাও নিয়ে যায়। এছাড়া তিনটি মোবাইল ফোনসেট, চার্জলাইট, একটি জুতা ও ৫ লিটারের তেলের কন্টেনারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুটে নেয়। ঘরে আরও মালামাল আছে কিনা, সেজন্য তাদের তিনজনকে মারধর করে ডাকাতরা। আল আমিনের ৫ মাসের গর্ববতী স্ত্রী বৃথীকে নির্যাতন করা হয়, তার পেটেও আঘাত করা হয়। এতে অসুস্থ হয়ে পড়ে অন্তঃসত্ত্বা ওই নারী। হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। ভয়ে সে এখন বাবার বাড়িতে অবস্থান নিয়েছে। ডাকাতদল যাবারকালে তিনজনকে বেধে একটি কক্ষে আটকে রাখে। পরে দাঁতদিয়ে কামড়ে বাঁধন খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে প্রতিবেশিদের বিষয়টি জানায়। এরই মধ্যে ফজরের আজান হয়ে যায়। ডাকাতরা প্রায় ঘণ্টা খানেক ওই বাড়িতে অবস্থান নেয়। পরদিন পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
একই রাতে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে পাশের খোদাওয়ান্দপুর গ্রামের নুরুল ইসলাম মিয়ার বাড়িতে। পুরনো টিনের ঘরে শিশুসহ চারজন ঘুমিয়ে ছিলেন। রাত ২ টার দিকে ডাকাতদল ওই বাড়িতে হানা দেয়।
নুরুল ইসলামের ছেলে জাকির হোসেন জানায়, তার বাবা-মা চিকিৎসার কাজে ঢাকায় ছিলেন। ঘটনার রাতে (সোমবার দিবাগত রাত) ঘরের একটি কক্ষে তার বড়ভাই তানবির হোসেন, তার স্ত্রী রাফিয়া আক্তার ও শিশুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। প্রায় ২ টার দিকে বাহির থেকে ঘরের পেছনের দরজা খুলে ৫ জন লোক ঢুকে। বাহিরে আরও ৪/৫ জন পাহারায় ছিল। তাদেরকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি ও মারধর শুরু করে ডাকাতরা। জাকিরের মাথায় লোহার রড দিয়ে আঘাত করা হয়। তাদের হাত-পা বেধে ফেলে। ঘরে থাকা দুই জোড়া কানের দুল, নগদ সাড়ে ১৪ হাজার টাকা ও ৫ টি মোবাইল ফোন নিয়ে যায় ডাকাতরা। ঘরে অন্য মালামাল আছে কিনা জানার জন্যেও তাদের মারধর করা হয়৷
এর আগে গত ১৭ ফেব্রয়ারি (সোমবার দিবাগত রাত) ২ টার দিকে ডাকাতদল হানা দেয় খোদাওয়ান্দপুর গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক মাহবুব আলমের বাড়িতে।
মাহবুব জানায়, রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে তিনি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ঘর থেকে বের হন৷ কাজ শেষে তিনি ঘরে ঢুকতে গেলে ৫/৬ জন লোক তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ঘরে ঢুকে। বাহিরে আরও কয়েকজন অবস্থান নেয়। ডাকাতরা মাহবুব, তার স্ত্রী শারমিন ও মা পেয়ারা বেগমকে বেধে মারধর করে ঘরের মালমাল লুটে নেয়।
তিনি জানান, ঘরে থাকা ১৩ থেকে ১৪ আনা স্বর্ণ, নগদ ২০ হাজার টাকা, দুটি মোবাইল ফোন ও পোষ্ট অফিসের একটি পস মেশিন লুটে নেয়।
তিনি অভিযোগ করেন, ডাকাতির ঘটনায় পুলিশ মামলা নেয়নি। তবে পস মেশিন লুটের ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরী করেছেন, তাতে মেশিনটি হারিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে যে তিন বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, স্থানীয়দের মতে সবগুলো ঘটনা প্রায় একই ধরনের। একই ডাকাত বাহিনী দ্বারা ঘটনাটি সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের। তবে ঘটনাগুলোকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী ও স্থানীয় লোকজনের।
বশিকপুরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) আবুল কালাম বলেন, আমার ওয়ার্ডের আবুল বাশারের বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। একই রাতে পাশের ৮ নম্বর ওয়ার্ডেও ডাকাতির ঘটনা শুনেছি।
ওই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) শরীফ উল্যা বলেন, এক রাতে দুই বাড়িতে এবং তার আগে এক বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। এসব ঘটনায় এলাকার মানুষ আতঙ্ক রাত পার করছে। সামনে ঈদ আসছে, তাই আতঙ্ক আরও বেড়েছে। আপাতত স্থানীয়দের উদ্যোগে রাত্রিকালীন পাহারার জন্য দল গঠন করা হয়েছে। এলাকার লোকজন একে অপরের সাথে সমন্বয় করে পাহারা দিচ্ছে। তবে এটা স্থায়ী সমাধান নয়, পুলিশি তৎপরতা বৃদ্ধি পলে জনমনে স্বস্তি পেত।
তিনি বলেন, ডাকাতির ঘটনাগুলো তদন্ত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে অস্ত্রধারী ডাকাতদের গ্রেফতার করে।
এ বিষয়ে চন্দ্রগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোরশেদ আলম বলেন, ঘটনাস্থলে আমি গিয়েছি। ঘটনার সাথে ভুক্তভোগীদের তথ্যে মিল পাওয়া যায়নি। কারা ঘটনার সাথে তাদেরকেও চিনে না। তারপরেও তাদেরকে বলেছি থানায় মামলা বা লিখিত অভিযোগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু কেউ আজ পর্যন্ত অভিযোগ দেয়নি। এলাকার লেকজন যদি অপরাধরীদের বিষয়ে তথ্য দেয়, তাহলে তাদেরকে গ্রেফতার করা হবে। এছাড়া যে কোন ঘটনায় পুলিশকে জানালে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যবস্থা নেবে।
মন্তব্য করুন