বুধবার
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
কক্সবাজারে ৮৮ খুন, ১২৭ ধর্ষণ প্রসঙ্গে সাজেদুর

‘আমি তো অথর্ব এসপি’

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৭ পিএম
পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান
expand
পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান

আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে গুলি। বিচারককে পিস্তল দেখিয়ে ভয় দেখানোর ঘটনা। জানাজা চলাকালেই হত্যা মামলার সন্দেহভাজনকে নির্দোষ ঘোষণা করে দেওয়া এক সংবাদ সম্মেলন। আর প্রতিবাদী সাংবাদিকের প্রতি থানার ভেতর থেকেই হুমকি- কক্সবাজারের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন একের পর এক অস্বাভাবিক দৃশ্যের সমষ্টি।

জেলা পুলিশের নিজস্ব হিসাবই বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই- এই সাত মাসে জেলায় খুন হয়েছে ৮৮ জন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১২৭টি, আর অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছে ২৯৭টি। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে দেড় শতাধিক। চলতি মাসেও থামেনি সেই ধারা- ইতিমধ্যে আরও দুজন খুন হয়েছেন।

স্থানীয় আইনজীবী, সাংবাদিক ও পুলিশ বিভাগের ভেতরের একাধিক সূত্র একবাক্যে বলছেন- স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকের ইতিহাসে কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এতটা নাজুক আর কখনো হয়নি। আর এই অবনতির কেন্দ্রে বারবার উঠে আসছে একটি নাম- পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান।

গত ৩০ নভেম্বর কক্সবাজার আদালত প্রাঙ্গণে এক যুবক পিস্তল উঁচিয়ে ভয় দেখান জেলা জজ পদমর্যাদার এক বিচারককে। ঘটনার সাক্ষী আরও দুই বিচারক তৎক্ষণাৎ তৎকালীন সদর থানার ওসি ছমিউদ্দীনকে খবর দেন, সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান। পুলিশ সুপারকেও জানানো হয় বিষয়টি। কিন্তু ভুক্তভোগী বিচারকের ভাষ্য- আজও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

নিরাপত্তাহীনতার এই বোধ থেকেই জানুয়ারির শুরুতে একাধিক বিচারক পুলিশ সুপার বরাবর চিঠি দিয়ে গানম্যান চেয়েছিলেন।

অভিযোগ আছে, সেই চিঠির জবাবই দেওয়া হয়নি, গানম্যানও মেলেনি। এর মধ্যেই গত ২৪ মে দুপুরে আদালত চত্বরে ঘটে যায় আরও ভয়াবহ ঘটনা। প্রকাশ্য গোলাগুলিতে আহত হন দুজন, তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হন কয়েকজন। এই ঘটনার পর বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী- সবার মধ্যেই নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল মন্নানের ভাষ্য, স্বাধীনতার পর কক্সবাজারে এত ভয়াবহ আইনশৃঙ্খলার অবনতি তিনি আর দেখেননি।

তিনি বলেন, আদালত চত্বরে গোলাগুলি এবং বিচারকদের অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানোর অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

তার মতে, উখিয়া ও টেকনাফের বহু এলাকায় সন্ধ্যা নামার আগেই অপরাধীদের ভয়ে নেমে আসে সুনসান নীরবতা। কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী ও পর্যটন জেলায় দক্ষ, অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা জরুরি ভিত্তিতে পদায়নের দাবি জানান তিনি।

গত ২৪ মার্চ রাতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ছুরিকাঘাতে খুন হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক খোরশেদ আলম। পরিবারের দাবি, তার সঙ্গী তারিনের ব্যাগ থেকেই উদ্ধার হয় হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি, এবং এর আগে তারিন তাকে হুমকিও দিয়েছিলেন।

ঘটনার পর তারিনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হলেও পরদিন, ২৫ মার্চ, খোরশেদের জানাজা চলাকালীনই সংবাদ সম্মেলন করেন পুলিশ সুপার। মামলা দায়েরের আগেই, কোনো তদন্ত ছাড়াই তারিনকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। একইসঙ্গে খোরশেদের কাকা তারেককে দাবি করা হয় হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে। পরবর্তীতে তারেকের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে এলে তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আর পুলিশের সেই দাবিও পড়ে যায় বিতর্কের মুখে।

পরিবারের অভিযোগ, তারিনকে আসামি না করে বানানো হয় সাক্ষী, আর প্রকৃত সন্দেহভাজনদের বাদ দিয়ে মামলা করা হয় ১০ জনের বিরুদ্ধে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পুলিশ সুপারের কড়া আপত্তির কারণেই তারিনকে জিজ্ঞাসাবাদ বা তাকে ঘিরে কোনো অভিযান চালানো যায়নি, ফলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতে থাকা সত্ত্বেও হাত গুটিয়ে থাকতে বাধ্য হয় পুলিশ। উপকমিটি গঠনের কারণে মূল তদন্তও বাধাগ্রস্ত হয় বলে জানা যায়। ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের দাবি সত্ত্বেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় মামলার বাদী নাওশাদ হোসেন আদালতের মাধ্যমে মামলাটি স্থানান্তর করান পিবিআইয়ে। তারিন এখন আত্মগোপনে রয়েছেন বলে একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

গত ২২ এপ্রিল খুরুশকুলে মন্দিরের সেবায়েত নয়ন সাধুকে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লেখেন সাংবাদিক অন্তর দে বিশাল। তার প্রতিবেদনের সূত্র ধরে পুলিশ গ্রেপ্তার করে আবদুর রহিম নামে একজনকে, আর সেই অগ্রগতি নিয়েও ফলোআপ প্রতিবেদন লেখেন অন্তর দে।

কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশের পরই তার কাছে আসে হুমকি। সংবাদ মুছে না ফেললে তাকে ওই হত্যা মামলাতেই জড়ানো হবে। অন্তর দের অভিযোগ, এই হুমকি দেন পুলিশ সুপারের ঘনিষ্ঠ এলআইসি সদস্য সোহেল, যদিও সোহেল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিষয়টি পুলিশ সুপারকে জানালে তিনি ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে উল্টো প্রশ্ন করেন, আপনাকে নিউজ করতে কে বলছে? এমনকি সাধারণ ডায়েরি না করারও পরামর্শ দেন বলে অভিযোগ অন্তর দের। পরে দ্বিতীয় দফা হুমকি আসার পর সংবাদকর্মীদের প্রতিবাদের মুখে সদর থানা জিডি গ্রহণ করে।

অন্তর দে বলেন, জিডি তদন্ত করতে হবে না মানে কী? পুলিশ সুপার কি আমার লাশের অপেক্ষা করছিলেন?

এই ঘটনার প্রতিবাদে সাংবাদিকরা মানববন্ধন করেন, পূজা উদযাপন কমিটিও দাবি জানায় জড়িতদের বিচারের। শেষ পর্যন্ত কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের হস্তক্ষেপে আন্দোলন থামলেও সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

অন্যদিকে রামু থানা পুলিশের বিরুদ্ধে বড় একটি ইয়াবা চালান আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে তথ্য-প্রমাণসহ বক্তব্য জানতে চাইলে জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক শাহেদ ফেরদৌস হিরুকে পুলিশ সুপার পাল্টা প্রশ্ন করেন, ইয়াবা নিয়ে সাংবাদিকদের এত আগ্রহ কেন।

হিরুর অভিযোগ, নানা অনিয়মের তথ্য দেওয়ার পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পুলিশ সুপারের ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণই এর জন্য দায়ী বলে মনে করেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা কমিটির একাধিক সদস্যের অভিযোগ, পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে কেউ বক্তব্য দিতে চাইলে পুলিশ সুপার মাঝপথেই তা থামিয়ে নিজে কথা বলা শুরু করেন। এতে সভায় মুক্তভাবে মতামত প্রকাশের পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতেই তিনি মুঠোফোনে কথা বলেছেন, কখনো কখনো উচ্চস্বরে- যা নিয়ে উপস্থিতদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিরক্তি।

সম্প্রতি এক বৈঠকে এই আচরণের প্রকাশ্য প্রতিবাদ জানান কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা কমিটির এক সদস্য বলেন, যার নিজের মধ্যেই ন্যূনতম শৃঙ্খলা নেই, তিনি কীভাবে একটি জেলার পুলিশ বাহিনীকে শৃঙ্খলার সঙ্গে পরিচালনা করবেন?

আতঙ্ক আর অস্থিরতা যেন ছড়িয়ে পড়েছে জেলা পুলিশের অভ্যন্তরেও। অন্তত ৩৫ জন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলার অবনতির পেছনে তারা দায়ী করছেন পুলিশ সুপারের হঠকারী সিদ্ধান্ত, অদক্ষতা ও দুর্বল পুলিশিংকে।

সম্প্রতি গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগে বদলি করা হয়েছে ১০১ জন পুলিশ সদস্যকে। যার মধ্যে ৭ জন ইন্সপেক্টর, ৩৬ জন এসআই, ২৪ জন এএসআই এবং ৩৪ জন কনস্টেবল। এদের প্রায় ৯৫ শতাংশই চট্টগ্রাম অঞ্চলের, জানাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

অভিযোগ উঠেছে, অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের বেছে বেছে সরিয়ে সেই জায়গায় বসানো হয়েছে অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞদের। অথচ যারা সরে গেছেন, তারাই এলাকার রাস্তাঘাট, অপরাধপ্রবণ পয়েন্ট আর অপরাধীদের সম্পর্কে ভালো জানতেন, দ্রুত অভিযান চালাতে পারতেন। ফলে মাঠপর্যায়ের পুলিশিং দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে দাবি কর্মকর্তাদের।

কারও কারও মতে, পুলিশ সুপারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করাই কাল হয়েছে অনেকের জন্য। বদলির পাশাপাশি এসিআর ও সার্ভিস বুকে বিরূপ মন্তব্যের ভয়ও কাজ করছে বাহিনীর ভেতরে।

এত অভিযোগের মুখে পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমানের ব্যাখ্যা তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত। তার ভাষ্য, সারা দেশে মাসে গড়ে প্রায় ৩০০টি খুন হয়, তার মধ্যে কক্সবাজারের হিস্যা ১৫ থেকে ২০টি। যা নতুন কিছু নয়, আগেও হতো। তার দাবি, এসব খুনের বেশিরভাগই পরকীয়া ও পারিবারিক কারণে ঘটছে, আর জড়িতদের ইতিমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অন্য অভিযোগ প্রসঙ্গে কিছুটা বিরক্তির সুরে তিনি গণমাধ্যমে বলেন, আমি তো অথর্ব এসপি। আপনাদের প্রিয় এসপি যখন ছিল, তখনো মার্ডার এমন হতো। এই বলে ফোনের সংযোগ কেটে দেন তিনি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank